বুধবার, ২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আয়ব্যয়ে ভারসাম্যহীনতায় বেড়েছে টাকার সংকট

আয়ব্যয়ে ভারসাম্যহীনতায় ডলারের পাশাপাশি বেড়েছে টাকার সংকট। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে সরকারের আয়ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না, সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি সরকার ব্যাংক ঋণ নেওয়া কমিয়ে দেওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মার্চে শুরু হওয়া মহামারির কারণে দীর্ঘদিন লকডাউনে ছিল দেশ। ওই সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়েছিল। ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ও কম হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

পরের অর্থ বছরেও রাজস্ব আদায় হয়নি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলার সংকটের পাশাপাশি আমানত প্রবাহ কমে যাওয়ায় টাকার সংকট বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দেওয়া শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে আর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক রাখতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে না সরকার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট অংশ না নেওয়ায় বিকশিত হচ্ছে না বন্ড মার্কেট। ফলে এই মার্কেট থেকেও বেশি ঋণ নিতে পারছে না সরকার। একই সঙ্গে কমেছে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান। ফলে বৈদেশিক খাতে অর্থের প্রবাহ কমার পাশাপাশি টাকার সংকট আরও প্রকট হয়েছে। যদিও ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে সরকার।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিডিপির তুলনায় ঋণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে না পৌঁছালেও ঋণের ক্ষেত্রে সরকারের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের ঋণের সুদের চাপ অনেক বাড়ছে। ঋণ পরিশোধ করতে হয় রাজস্ব আদায় থেকে। তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত সাশ্রয়ী হওয়া।

এদিকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে বলে উঠে এসেছে অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে। অর্থ বিভাগ বলেছে, অর্থবছরের শেষের দিকে ব্যয়ের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অপরিকল্পিত ঋণ ও ঋণজনিত ব্যয় সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগ একটি পরিপত্র জারি করেছে। সেখানে সময়মতো বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থবছরের শুরুতে সুনির্দিষ্ট ও সময়নিষ্ঠ পরিকল্পনা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্রের ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে পরিশোধ করেছিল ৩ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নতুন ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করেছে ৩৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছিল ১১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিয়েছিল ১৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে আগের ঋণের স্থিতি থেকে পরিশোধ করেছে ১৮ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার ঋণ নিয়েছিল ২৫ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নিয়েছে ৬ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।

২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে বৈদেশিক খাত থেকে ঋণ নিয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নিয়েছে ১২ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি খাত মিলে গত অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে নিট অর্থায়ন হয়েছিল ৩১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে বিদেশি অনুদান কমেছে ৪০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে কম ছিল ২৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

All Rights Reserved ©2024