সোমবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কিছু অপেক্ষা থেকেই যায়

গ্রামের নাম সোহাগপুর।
সবুজে ঘেরা প্রকৃতি, মাঠ ভরা ধান,গোয়াল ভরা গরু,ভোর না হতেই মই , গরুর পাল নাঙ্গল হাতে কৃষক মাঠে নামবে এমনটাই ভাবা যায়।

হ্যাঁ। ভাবনাটা ঠিক।
তবে যুগের সাথে গ্রাম পাল্টেছে।আধুনিক হয়েছে গ্রামীন জনপদ।
আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সব কিছুতে।
তাই হয়তো আগের মত মেঠোপথ, গরুর গাড়ি এসব এখন এক প্রকার অতীত।
তবুও গ্রাম মানেই অন্য রকম মায়া।

সোহাগপুর গ্রামটাও এর ব্যাতিক্রম নয়।
কত তরুন বৃদ্ধ হলো, কত বৃদ্ধ হারিয়ে গেলো,আবার কত নতুন জন্ম নিলো।
গ্রামটা সোহাগপুর ঠিকই রয়ে গেলো।

এ গ্রামেরই বিনয়ী এবং অত্যন্ত ভদ্র হাজী আঃ মজিদ সাহেব।
দু ছেলে এক মেয়ে আর বউকে নিয়ে যার সুন্দর সুখী একটা পরিবার।
ছেলে দুজন পড়াশোনার জন্য ঢাকায়।

স্ত্রী আর ছোট মেয়ে হাসিবাকে নিয়ে সোহাগপুরেই থাকেন হাজী আঃমজিদ।
আঃমজিদ সাহেব আবার গাঁয়ের ধ্যান দরবারের একজন মুরব্বি।
তাই সামাজিক কাজ নিয়ে বেশি সময় ব্যস্ত থাকেন।
পরিবারকে সময় খুব বেশি একটা দিতে পারেন না।
এর জন্য স্ত্রীর কাছ থেকে মধুর বকাও ঝকা ও খেতে হয় ওনার।
এসব বকা ঝকাতে আঃ মজিদ তেমন কিছু মনেই করে না।
ওনি যেই সেই রয়ে গেলেন।

আঃ মজিদের একমাত্র মেয়ে হাসিবা এ বৎসর অষ্টম শ্রেনীতে উঠলো।
তাই স্কুলের মাষ্টার মশাইকে বলে দিয়ে আসলো,
আমার মেয়ে যেন ভালো রেজাল্ট করে।
সেই ভাবেই পড়ানোর ব্যবস্থা কইরেন মাষ্টার মশাই।
মাষ্টার মশাই আঃমজিদ সাহেবের কথায় সায় দিয়ে বললেন আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

আঃমজিদ সাহেবের মেয়ে রোজ স্কুলে আসা যাওয়া করে।
প্রতিদিনের মত আসার পথে খেয়াল করলো।একটা ছেলে দূর থেকে একটা কদম বৃক্ষের নীচে কয়েকদিন যাবৎ এই সময়ে, এই ভাবে ফেল ফেলিয়ে তাকায় থাকে।
হাসিবা( আঃমজিদের মেয়ে) বিষয়টা নজরে নিলো।

বান্ধবীদের বিষয়টা জানালো,
এক বান্ধবী খবর নিয়ে জানলো ছেলেটার নাম অপূর্ব, তাদের বাড়ি গ্রাম নয়নপুর।

ছেলেটা দেখতে বেশ সুন্দর আর স্মার্ট।
আর স্মার্ট ছেলেরা এভাবেও দেখতে সুন্দর।

তবে হাসিবা আরেকটা বিষয় আরো গভীরে দেখলো।
বিষয়টা হলো হাসিবা রোজ স্কুলের সাদা ড্রেস পরে স্কুলে যায়।
আর ফিরার পথে দেখে ঐ অপূর্বও সাদা সার্ট পরে কদম বৃক্ষের ছায়ায় বসে, হাসিবার দিক তাকায় থাকে।

দিন যায়,মাস আসে।
হাসিবা অপূর্বের মুখোমুখি কথা হয়।
ধীরে ধীরে একজন আরেক জনের খোঁজ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করতো।

এ অপেক্ষা গুলোর অবসান ঘটিয়ে অপূর্ব একদিন হাসিবাকে ভালোবাসার কথা বলে ফেললো।
হাসিবাও হেসে বললো, এতো লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
আপনি যে ভালোবাসেন,তা আগে থেকেই বুঝতাম মিঃ অপূর্ব ( অপু ভাই)

হাসিবার মুখ থেকে এমনটা শোনে অপূর্ব বিস্মিত।

অপূর্বও বলতে শুরু করলো,
আপনিও যে আমাকে ভালোবাসেন।
তা আপনার তাকানো দেখেই বুঝতাম,
মিস হাসিবা ( হাসু আপা)।

হাসি আনন্দে প্রেমময় জীবন কাটছে দুজনার।

তবে বেশি দিন যায়নি।দু বছরের মাথায়ই হাসিবা অপূর্বের প্রেম সম্পর্কে জেনে যায় হাসিবার পরিবার।

এবার তারা উঠে পরে লাগে, কিভাবে হাসিবাকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে বিদায় করা যায়।

এদিকে অপূর্ব বেকার, তাই অপূর্ব সম্পর্কে বাবা মায়ের কাছে জোর দিয়ে তেমন কিছু বলতে পারে না হাসিবা।

রোজ সকাল বিকাল পাত্র পক্ষ আসছে হাসিবাকে দেখতে।
হাসিবা কাউকেই পছন্দ করছে না।
বিষয়টা আর বুঝার বাকি নেই।

হাসিবার বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন,
হাসিবাকে অপূর্বের হাতে তুলে দিবেন।
তবে অপূর্ব কোনদিন শ্বশুড় বাড়ি থেকে কোন অর্থের আবদার করতে পারবে না।
সব শর্ত মেনে অপূর্ব হাসিবাকে বিয়ে করে ঘরে তুললো।

এর মাঝে অপূর্ব হাসিবাকে নিয়ে শহরে চলে এলো।
অপূর্বের একটা চাকরিও জোগাড় হলো।
মোটামুটি চলে যাচ্ছে হাসু -অপুর টোনাটুনির সংসার।
বছর ঘুড়তে এ সংসারে এক ফুট ফুটে অতিথি এলো।
দিন গুলো বেশ ভালো কাটছে।

দেখতে দেখতে বিয়ের প্রায় কুঁড়ি বছর হতে চললো।
হাসু – অপুর সংসারে এখন দুজন মেয়ে সন্তান ও আছে।
খুব সুখী সংসার দুজনার।

একদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ অপূর্বের বুকে ব্যাথা হলো,পাশে থাকা হাসিবাকে বললো, এই হাসু আমার বুক ব্যাথা করছে।
ঘুম মাখা চোখে হাসিবা বললো ধ্যাত অপু ঘুমাও তো,আদর পাওয়ার এত বাহনা ধইরো না তো।দিনে আদর নিও,
এখন একটু ঘুমাতে দেও,
ব্যাথায় অপূর্ব আর কিছু বলতে পারেনি।

সকালে ফজর নামায হলো,
নামায শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে অপূর্ব পাশের একজনকে বললো,শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে।
পাশের লোকটা অপূর্ব কুশলাদী জানার মধ্যেই বুকে ব্যাথা বলে বুক চেপে রাস্তায় বসে পরলো।

অপূর্বর বাসায় খবর দেয়া হলো।
কান্না আর চিৎকারে অপূর্বের হাসুটা এসে সবাই মিলে হসপিটালে নিয়ে গেলো।
কর্তব্যরত ডাক্তার জানালো অপূর্ব আর নেই।

এটুকু শোনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো হাসিবা।
শুধু চোখের পানি ঝরছে, কি যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে।
কিছুই বলতে পারছে হাসিবা।
শুধু অপূর্বর বুকটার মাঝে মাথা রেখে, অপূর্বর মুখটার দিক তাকিয়ে অঝোর কেঁদে যাচ্ছে।

অপূর্বকে দাফন শেষে সবাই যখন যার যার কাজে ফিরে যাচ্ছে।
পাগল প্রায় হাসিবাটা বুক চাপরাচ্ছে আর কি যেন বিলাপে বিরবির করে বলে যাচ্ছে।

হাসিবার দু মেয়ে অবস্থা দিন দিন বেগতিক দেখে,
তাদের মাকে আর শহরে রাখলো না।
নিয়ে এলো গ্রামের বাড়ি সোহাগপুরে।

এখানে এসেও হাসিবা বিরবির করে বিলাপ পরে।
কেউ থামাতে পারে না এ কান্না।

হাসিবা এখন বিধবার সাদা শাড়ি পরে সেই কদম বৃক্ষের নীচে গিয়ে কি যেন বলতে থাকে,কার যেন অপেক্ষায় থাকে।

এ অপেক্ষা আর কারো জন্য নয়।
এ অপেক্ষা যে হাসিবার প্রিয় মানুষ অপূর্ব অপুর জন্য,
আজ হাসিবাকে কেউ আর হাসু নামে ডাকে না।
আজ হাসিবার সাদা স্কুল ড্রেসের সাথে মিল রেখে তার প্রিয় মানুষটা সাদা সার্ট পরে আসে না।

আজ ও হাসিবার শরীরে সাদা পোষাক,
তবে সেই সাদা স্কুল ড্রেস নয়।
সাদা বিধবা শাড়ি পরে হাসুটা তার অপুর জন্য কেঁদে কেঁদে অপেক্ষা করে যায়।
এই অবেলায় যে আর হাসুর অপুটা ফিরবে না।
এ অবেলায় যে হাসুর স্কুল ড্রেসের সাথে মিল রেখে, হাসুর অপুটা আর সাদা সার্ট পরে আসবে না।

তবুও কদম বৃক্ষের নীচে সাদা শাড়িতে হাসুটা তার অপুর অপেক্ষায়,
অপেক্ষায় যদি তার অপুটা সাদা সার্ট পরে আসে,,,

বাস্তবতায় হয়তো কিছু অপেক্ষা থেকেই যায়,,,,

— জাহিদ হাসান আবেদ—

 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  

All Rights Reserved ©2024