বুধবার, ১৯শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

টানা ১৪ ঘণ্টার তাণ্ডবে হতবাক উপকূলবাসী

৭০-র ঘূর্ণিঝড় থেকে সিডর-আইলা কিংবা নার্গিস কোনো ঝড়েই এমনটা ঘটেনি। টানা ১২-১৪ ঘণ্টা তাণ্ডব চালায়নি কোনো ঘূর্ণিঝড়। অথচ রোববার দেশের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হানা রিমালের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। একটানা ১৪ ঘণ্টা এই ঝড় তাণ্ডব চালিয়েছে দেশের উপকূলীয় এলাকাজুড়ে। এমনকি সমুদ্র উপকূল থেকে প্রায় ১১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিভাগীয় শহর বরিশাল অতিক্রম করতেও ঝড়টি সময় নিয়েছে প্রায় ১৩ ঘণ্টা।

আর এই সময়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার। দমকা ও ঝড়ো হাওয়ায় যা বেড়ে দাঁড়াচ্ছিল ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত। অথচ স্থলভাগে ওঠার পর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ার কথা রিমালের। কিন্তু সম্পূর্ণ উলটো আচরণে পুরো দক্ষিণা ল পার করে উত্তরা লের দিকে চলে যায় এই মাঝারি আকারের ঘূর্ণিঝড়। পুরো বিষয়টিকে বিস্ময়কর আর উদ্বেগের বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হতে পারে। এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।

 

রোববার দুপুরের পর বাংলাদেশে আঘাত হানতে শুরু করে রিমালের অগ্রভাগ।  স্থলভাগে উঠে আসার পর পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও বরগুনা অ লে বেশি তাণ্ডব চালায় ঝড়টি। আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, মাঝারি আকারের ঝড় ছিল রিমাল। স্থলভাগে ওঠার সময় এর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০-১৪০ কিলোমিটারের কমবেশি হবে এমনটাই বলেছে তারা।

কলাপাড়া রাডার স্টেশনসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর দাায়িত্বশীলদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোটামুটি এই গতিবেগ নিয়েই উপকূলে আঘাত হানতে শুরু করে রিমাল। তবে বিপত্তি বাধে অন্যত্র। সমুদ্র থেকে স্থলভাগে উঠতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় নেয় ঝড়টি।

স্থানীয় আবহওয়া বিভাগের উচ্চ পর্যবেক্ষক বশির আহম্মেদ নিশ্চিত করেছেন এই তথ্য। কেবল এটাই নয়, রোববার মধ্যরাত ১২টার দিকে বরিশাল নগর অতিক্রম করতে থাকা রিমালের এই তাণ্ডব অব্যাহত থাকে পরদিন সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত। বশির আহম্মেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার মধ্যরাতে আঘাত হানার সময় রিমালকেন্দ্রিক বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার। দমকা ও ঝড়ো হাওয়ায় তা বেড়ে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছিল। এর ঠিক ১৩ ঘণ্টা পর সোমবার দুপুর ১টার রেকর্ডেও বরিশালে বাতাসের গতিবেগ মেলে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার। দমকা ও ঝড়ো হাওয়ায় যা বেড়ে ১১০ কিলোমিটারে পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছিল। আবহাওয়া বিভাগের তথ্যেই প্রমাণ মেলে যে, দুপুর ২টার পর বরিশালে কমতে শুরু করে বাতাসের গতি। ৪টা নাগাদ বরিশাল অতিক্রম সম্পন্ন করে রিমাল। অর্থাৎ বরিশাল অতিক্রম করতে ১৩ ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়েছে মাঝারি ক্ষমতার এই ঝড়।

একই ধরনের তথ্য এসেছে সাগর পারের কলাপাড়া, বরগুনার তালতলী ও উপকূলের অন্য এলাকা থেকে। তালতলীর উপজেলা চেয়ারম্যান রেজভি উল হক জমাদ্দার বলেন, রোববার বিকাল থেকেই ঝড়ের তাণ্ডব অনুভব করতে শুরু করি আমরা। পরিস্থিতি শান্ত হয় মধ্যরাতের পর। একটানা এত দীর্ঘ সময় ঝড় চলার কোনো স্মৃতি আমার জীবনে নেই। সিডর-আইলার সময় ৩০ থেকে বড়জোর ৪০-৪৫ মিনিট ঝড়ের তাণ্ডব দেখেছি। কিন্তু এবারই এত দীর্ঘ সময়ের ঝড় দেখলাম।

কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার তালুকদার বলেন, আমার বয়স এখন ৭০-এর বেশি। জীবনে অনেক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস দেখেছি। কিন্তু এ রকমটা আর কখনো দেখিনি। ১২-১৩ ঘণ্টা ধরে একইভাবে ঝড় হতে পারে এটা এই প্রথম দেখলাম। বরিশাল নগরের বাসিন্দা আনোয়ারুল হক বলেন, ঝড় শুরু হলে অপেক্ষা করি কখন শেষ হবে। কিন্তু এবারের ঝড় যেন শেষই হচ্ছিল না। কুয়াকাটার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি সাগর পারে। বহু ঝড় দেখেছি। কিন্তু এবারের এই ঝড় আমার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ১২-১৪ ঘণ্টার ঝড়ে এখানে কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া ছাড়াও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে অতিক্রমের কারণে এই দুর্বল ঝড়ই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু গাছপালা, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ এটা হওয়ার কথা নয়। কেবল ঝড়ের দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণেই হয়েছে।

বরিশাল আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আঘাত হানার বিষয়টি আমাদেরও ভাবাচ্ছে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও গবেষণা ছাড়া কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমেজ অ্যান্ড ইনফরমেশনের পরিচালক হাসান আবিদুর রেজা বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা যেটা ধারণা করছি তা হলো, উপকূলের কাছে এসে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে রিমাল। এর চোখ তৈরি হয়েছে স্থলভাগের একেবারে কাছে আসার পর। তাছাড়া রিমালের পুরো ডিরেকশন ছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে। এবার কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ কিংবা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে খুব একটা আঘাত করেনি এই ঝড়। পুরো বলয়টাই দেশের দক্ষিণ উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করেছে। ঝড়ের দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে এটা একটা কারণ হতে পারে। স্থলভাগের খুব কাছে এসে পূর্ণমাত্রার শক্তি অর্জন করায় স্থলভাগে ওঠার পরও একদিকে যেমন এর দুর্বল হতে দেরি হয়েছে, তেমনি ঝড়ের পুরোটাই বরিশাল অ লের ওপর দিয়ে যাওয়ায় সময়ও বেশি লেগেছে। উত্তরা ল পর্যন্ত যেতে যেতে ঝড় কিন্তু ঠিকই দুর্বল হয়েছে। আরেকটা হতে পারে যে, স্থলভাগে ওঠার পর গতি কমে যাওয়ায় পটুয়াখালী-বরিশাল অ ল পার হতে বেশি সময় লেগেছে। তবে এসবই প্রাথমিক ধারণা। গবেষণা ছাড়া এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা বা সিদ্ধান্ত পাওয়া সম্ভব নয়।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  

All Rights Reserved ©2024