শনিবার, ১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশ টু আমেরিকা-‘সোনিয়া কাদির’ এর এক অনবদ্য সৃষ্টি

সারওয়ার চৌধুরীঃ বাংলাদেশ টু আমেরিকা, প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিক লেখিকা সর্বোপরি আমার খুবই শ্রদ্ধাভাজন একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব ” সোনিয়া কাদির ” এর এক অনুপম অনবদ্য সৃষ্টি, একমনে এক নাগাড়ে পড়ে নেয়ার মত একটা মননশীল গ্রন্থ।
বাংলাদেশী আমেরিকানদের সংগ্রাম মুখর প্রাথমিক জীবনের এক জীবন্ত দলিল হতে পারে এই  ” বাংলাদেশ টু আমেরিকা ” গ্রন্থখানা। একই বইয়ের মধ্যে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদ এবং সেই সাথে লেখিকার অসামান্য মুন্সিয়ানায় রচিত গ্রন্থটি খুব সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করবে, আপ্লুত করবে, নিয়ে যাবে এক গভীর ভাবনার ভুবনে। লেখিকার গভীর পর্যবেক্ষণের রসদে মোড়ানো প্রতিটি লাইনে জীবন্ত হয়ে উঠা কথাগুলো খুব সহজেই আলোড়িত করবে পাঠকমহলকে , নিয়ে যাবে অন্যরকম এক তৃপ্তির জগতে ।
আমেরিকার বুকে বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের অদম্য সাহসের কথা, তাদের জীবনের কথা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও কিভাবে তারা একটা অচেনা, অজানা পরিবেশকে আয়ত্বে নিয়ে এগিয়ে গেছেন, প্রথম প্রজন্মের কয়েকজন আলোকিত বাংলাদেশীদের কথা, আমেরিকার দৈনন্দিন জীবনাচারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো লেখিকার সৃষ্টিশীল ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে খুব সহজেই এই গ্রন্থটি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম সহ বহু ভাষাভাষি সমৃদ্ধ আমেরিকার অন্যান্য নাগরিকদেরও আকৃষ্ট করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখিকা তার গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন ” পাখি উড়ে গেলে পালক ফেলে যায়। মানুষ মারা গেলেও স্মৃতি রেখে যায়। অতীত কখনও মুছে যায় না। বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। ” মুলত ভূমিকার মাধ্যমেই লেখিকা গ্রন্থের ভেতরকার সারকথা খুব সুন্দর এবং সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন।
 আমেরিকার অভিবাসী নীতি , সেই শুরু  থেকে এখন পর্যন্ত কেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে আমেরিকা আসতে উদগ্রীব সেটি তুলে ধরতে গিয়ে লেখিকা বলেছেন ” অসংখ্য পাহাড়, সাগর মহাসাগর, নদী, পশু-পাখি, বৃক্ষ, বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর ও গুচ্ছ গুচ্ছ সুন্দরের সমষ্টি নিয়ে মানবিক এক দেশ আমেরিকা। আশ্রয়প্রার্থী, দেশছাড়া, কূলছাড়া, স্বজন- পরিজন ছাড়া বিপন্ন অভিবাসী মানুষদের আমেরিকা তার অবারিত বুকে আশ্রয় দেয়, পরম মমতায়। ভরসা দেওয়া, সাহস দেওয়া আমেরিকায় আছে – চলার স্বাধীনতা, বলার স্বাধীনতা, ধর্মের- কর্মের স্বাধীনতা। “
লেখিকার পিতা আমেরিকা আসা প্রথম প্রজন্মের একজন গর্বিত বাঙালি ” নবাব আলী “, যার জন্ম ১৯০৬ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলাধীন ছোটদেশ গ্রামে, যিনি আমেরিকা এসেছিলেন একজন ভারতীয় হিসেবে, পরবর্তীতে পাকিস্তানী এবং সর্বশেষে গর্বিত বাংলাদেশী। এই গ্রন্থে আমরা জানতে পারি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নবাব আলী সহ তৎকালীন আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশীরা কিভাবে বাংলাদেশের সমর্থনে বহির্বিশ্বের মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন, রাস্তায় নেমে এসেছিলেন তার অন্যতম একটা প্রচেষ্টা হচ্ছে আমেরিকার বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ” কনসার্ট ফর বাংলাদেশ “।
নবাব আলী কৈশোর বয়সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অদম্য স্পৃহায় অনেক চেষ্টার মাধ্যমে জাহাজে করে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে, সেখান থেকেও আমরা বিলাত প্রবাসী প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশীদের সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারি, পরবর্তীতে তিনি পাড়ি জমান আমেরিকায়।
আমেরিকায় এসে জীবনের প্রয়োজনে বাস্তবতার তাড়নায় এখানে তিনি ভিনদেশী একজন মহিলার সাথে সংসার জীবন শুরু  করেন, দুই পুত্র সন্তানের জনক হন এবং পরবর্তীতে ডিভোর্সের মাধ্যমে সেই  বিবাহিত জীবনের ইতি টানেন তবে তার সন্তানদের সাথে সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন ছিল আমৃত্যু। দেশে গিয়ে তিনি এক মহিয়সী নারী খোদেজা খাতুনের সাথে আবারও সংসার শুরু করেন, সেই সংসারে উনার তিন মেয়ে ও একছেলে, যাদের মধ্যে প্রথম সন্তান হচ্ছেন এই গ্রন্থের রচয়িতা ” সোনিয়া কাদির “।
আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশীদের উদ্দেশ্যে লেখিকা বলেছেন ” আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের উচিত, আমেরিকায় ভিত্তিপ্রস্থর যারা স্থাপন করেছেন – তাঁদের আগমন, জীবনধারণের সংগ্রাম, অস্তিত্ব, বর্তমান বংশধরদের কে কোথায়, সেসব ইতিহাস অনুসন্ধান করে বের করা। বের করা দরকার কীভাবে সেই স্বশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মানুষেরা সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে নিজেদের মিশিয়ে ফেলেছিল। “
” বর্তমান আমেরিকা অভিবাসীদের আমেরিকা, আর আমার আব্বার অভিবাসনের সময়ের আমেরিকার চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই ইতিহাস না জানলে বর্তমান আমেরিকায় অভিবাসীদের ইতিহাস অসম্পূর্ণ, শিকড়হীন। “
” বাংলাদেশ টু আমেরিকা ” সংগ্রহে রাখার মত একটা অমূল্য গ্রন্থ, আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে এটা একটা শক্তিশালী দলিল হিসেবে কাজ করবে, আমাদের পূর্বসুরীদের প্রত্যেকের প্রবাসে আগমন, ঠিকে থাকা এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে রয়েছে অনেক ঘটনা, অনেক আনন্দ বেদনা, পাওয়া – না পাওয়ার দীর্ঘ তালিকা, তবে সবার তো আর সোনিয়া কাদিরের মত উত্তরসূরি নেই – যারা তাদের বিদগ্ধ চিন্তাশক্তির আশ্রয়ে , সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে, অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে তুলে ধরবে তাদের সেই যুগ যুগ ধরে পাথর সিমেন্টের মাঝে লুকিয়ে থাকা সমৃদ্ধ কষ্টগাথা, জীবন সংগ্রামের কঠিন সব ইতিহাসের ইতিবৃত্তগুলো।
আমেরিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশীদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সবাই যেন নিজ দায়িত্বে অভিবাসীদের জীবনগাঁথার এই দুর্লভ দলিলখানা পড়েন, সংগ্রহে রাখেন।।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

All Rights Reserved ©2024