শুক্রবার, ৩১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

রিক্সা ওয়ালা

লেখকঃ আফতাব মল্লিক

তোকে কতো করে বললাম একটু আগে বেরোবি। আজ প্রথম দিন। পরীক্ষার প্রথম দিন সবাই আগে আগেই বের হয়। আমার কথা শুনেছিলি? এখন স্টান্ডে যদিও একটা রিক্সা আছে তার মধ্যে কেউ নেই। বোঝো এবার। বাহাত্তর ঘন্টা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কি যে করিস! বোকো না তো মা । আমি আয়নার সামনে কখন দাঁড়ালাম। রিভাইজ করতে গিয়ে সময়ের দিকে খেয়াল করা হয়নি তাই,,,,,। কেন সারাবছর কি করিস? আগে থেকে পড়লে আজকে তো আর বইতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হতো না। মা মেয়ের কথা কাটাকাটির মাঝেই দুরে একটা অটো আসতে দেখে সোমা। ঐ তো একটা অটো আসছে। রাস্তার দিকে হাত দেখিয়ে বলে সোমা। কিন্তু ও যদি না যায়, ওর মা বলে। যাবে না কেন? একটু রেগেই বলল সোমা। না মানে তোর ইমারজেন্সি মানে তো আর অটো ওয়ালার ইমারজেন্সি না। তুমি চুপ করো। মাকে ধমক দিয়ে বলে সোমা। অটো রিক্সা টা স্ট্যান্ডে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই সোমা উঠে পড়ে বলে মা এদিকে ওঠো। ব্যাগটা আমাকে দাও। ওদেরকে দেখে অটো চালক বলে আমি তো এখন যাবো না। আমার আগে ঐ অটো যাবে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অটোটা দেখিয়ে বলে। কিন্তু ওতে তো ড্রাইভার নেই। আমরা দশ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি এখানে। বলে সোমা। আসবে আসবে। ড্রাইভার চলে আসবে। খেতে গিয়ে একটু দেরি করছে হয়তো। বলে ঐ অটো চালক। আপনি চলুন না। আপনি তো ফ্রি আছেন। বলে সোমা। ফ্রি থাকলেও যেতে পারবো না। আমি তো এই এলাম। ঐ অটো আমার আগে ছাড়বে। এটাই ইউনিয়নের নিয়ম। এই নিয়ম মেনেই আমরা অটো চালাই। নিয়ম ভাঙলে আমাদের জরিমানা হয়। কিন্তু আমার তো পরীক্ষা। এখন কি হবে আমার! মুখ শুকিয়ে বলে সোমা। ও আপনি পরীক্ষার্থী? তা এতো দেরি করলেন কেন ? এখান থেকে অনেক পরীক্ষার্থী গেছে আজকে। সবাই অনেক আগেই চলে গেছে। তবে চিন্তা নেই। এখান থেকে কলেজ হেঁটে কুড়ি মিনিট লাগে। আপনি হেঁটে চলে যান। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে অটো চালক। কিন্তু আর চল্লিশ মিনিট বাকি আছে পরীক্ষা শুরু হতে। পনেরো মিনিট আগে তো গেট বন্ধ করে দেবে। আর আমি এই টেনশন মাথায় নিয়ে হেঁটে যাবো কি করে? কান্না ভেজা গলায় বলে সোমা। তুমি একটু চলো না বাবা। অনুরোধের সুরে বলে সোমার মা। আচ্ছা চলুন। শেষ পর্যন্ত রাজি হয় অটো চালক। রাস্তায় যেতে যেতে অটো চালক জিজ্ঞাসা করে আপনার কোন সাবজেক্ট? আমার বাংলা অনার্স। আজ পেপার CC-1 । ফার্স্ট সেমিষ্টার। বলে সোমা। ও তাই? “বৈষ্ণবপদ সাহিত্যে বিদ্যাপতির অবদান আলোচনা করো”। “অনুবাদ সাহিত্যের ধারায় কবি কৃত্তিবাসের কৃতিত্ব বিচার করো”। ” সপ্তদশ শতকের কবি সৈয়দ আলাওলের কবিকৃতিত্ব আলোচনা করো”। চর্যাগীতিতে প্রতিফলিত সমাজ চিত্রের বর্ননা দাও” । এ কোয়েশ্চেন গুলো পড়ে এসেছেন? গতবছর এগুলো আসেনি তাই এবারের পরীক্ষায় খুব ইম্পর্ট্যান্ট। গাড়ি চালাতে চালাতে কথা গুলো বলে অটো চালক । মা মেয়ে একসাথে আশ্চর্য হয়ে যায় অটো চালকের কথা শুনে! আপনি কি করে এসব বলছেন? আপনি কি গ্র্যাজুয়েশ কমপ্লিট করেছেন? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে সোমা। না সে সৌভাগ্য হয়নি আমার! ফার্স্ট সেমিষ্টার শেষ করার পর আর কন্টিনিউ করতে পারিনি। চার বছর আগে পড়া ছেড়ে দিয়েছি। তবে প্রতিবছর পরীক্ষার প্রশ্ন গুলো দেখি। ভালো লাগে আমার। হতাশ কণ্ঠে বলে অটো চালক। কলেজ এসে গেছে আপনারা নামুন। ইউনিয়নের নিয়ম ভেঙে আপনাদেরকে নিয়ে আসার জন্য আমার অটো আজ সারাদিন বন্ধ থাকবে। আমি আজকে আর ভাড়া খাটতে পারবো না। এটাই ইউনিয়নের জরিমানা। ওমা তাই! আমার তো কিছু করার ছিল না তাই আপনাকে বাধ্য করলাম ,বলে সোমা। আমাদের জন্য আজ আপনার কতো ক্ষতি হলো! আপনি এটা রাখুন। ব্যাগ থেকে দুশো টাকা বের করে দেয় সোমা। না না। আপনি তিরিশ টাকা দেন। এটাই ভাড়া দুজনের। আপনি রাখুন না, বলে সোমা। না না বেশি নিতে পারবো না। যা ভাড়া তাই দেন। ভাড়া মিটিয়ে সোমা বলে আপনার নম্বরটা দেন। কাল থেকে মা আসবে না আমার সাথে। যদি অসুবিধায় পড়ি আবার, তাহলে আপনাকে ফোন করবো। নম্বর নিয়ে সেন্টারে ঢুকে পড়ে সোমা। যে কদিন পরীক্ষা ছিল তার মধ্যে আরো দুদিন ঐ অটোতে গেছে সোমা। অবশ্য ফোন করে না। স্ট্যান্ড থেকেই পেয়েছিল। যেতে আসতে সামান্য কথা হয়েছে দুজনের। সব পরীক্ষা শেষ হবার পর হঠাৎ একদিন ফোন করে সোমা। আমি সোমা। সেই যে আপনার অটোতে করে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম! আপনার নম্বর নিয়েছিলাম! বলে সোমা। ও আচ্ছা। বলুন। কেমন আছেন? বাকি পরীক্ষা গুলো কেমন হলো আপনার? ভালো হয়েছে বলে সোমা। আপনি কেমন আছেন? সোমা জিজ্ঞেস করে। আমাদের তো ভালো থাকতে হয়। খারাপ থাকলে সংসার চলবে কি করে? এরকম করে বলছেন কেন? সবাইকেই কষ্ট করতে হয়। বাড়িতে কে কে আছেন আপনার? জিজ্ঞাসা করে সোমা। আমি ছাড়া মা, বাবা,এক বোন এক ভাই। ভাই ইলেভেন এ পড়ে আর বোন নাইনে। আচ্ছা রাখছি। আমি এখন অটো চালাচ্ছি তো তাই। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। না না কেন মনে করবো। রোডে গাড়ি চালালে তো সাবধানে থাকতে হবেই। বলে সোমা। তারপর অনেক বার ফোনে কথা হয়েছে ওদের। ছেলেটার নাম সৌরভ। বাবা হাওড়ার একটা চটকলে কাজ করতো। হঠাৎ করে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার চিন্তায় বাবার প্যারালাইসিস হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় থেকেই এইট পর্যন্ত ছেলে মেয়েদের টিউশন পড়াতো সৌরভ নিজের হাত খরচের জন্য। কিন্তু বাবার অসুখের পর সংসারের দায়িত্ব ওর ওপর এসে পড়ে। অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়ে নিজের পড়াটা শেষ করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। তাই বাংলা অনার্স শেষ না করে ফার্স্ট সেমিষ্টার এর পর পড়া ছেড়ে দিয়ে অটো চালাতে শুরু করে। বাড়িতে ফিরে সন্ধ্যা বেলায় টিউশন করে নিজের বাড়িতেই। সবাই যা টাকা দেয় তাই নেয়। নির্দিষ্ট কোনো ফিজ নেই। ছেলে মেয়েদের পড়ানো, তাদের সাজেশন দেওয়া, এসবের মধ্যে নিজের স্বার্থকতা খুঁজে পায় সে। এরকম অনেক কথাই সোমা জেনেছে ওর কাছ থেকে। কেমন একটা মায়া হয় সোমার সৌরভের প্রতি। এসব ঘটনার পর কেটে যায় ছয় বছর! সোমা গ্র্যাজুয়েশ শেষ করে টিচার্স ট্রেনিং নিয়ে স্কুল সার্ভিস কমিশনে পরিক্ষা দেয়। চাকরিও পায় একটা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। সৌরভ অটো চালানো ছেড়ে দিয়েছে। এখন শুধু টিউশন পড়ায়। আজ টিউশন শেষে পেপারে একটা হেড লাইনের ওপর চোখ পড়ে সৌরভের। “বি পাশ রিক্সা ওয়ালা” ! খবরটা পড়ে তার চোখ জলে ভিজে যায়! নিজের জীবনের কথাগুলো মনে আঘাত দিয়ে উঠছে যেন। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে হেড লাইনটার দিকে। টিফিন দিয়েছি টেবিলে। খাবে এসো। পেপার দাও আমাকে। রেখে দিচ্ছি। পরে পড়বে। কি হলো তোমার চোখে জল কেন? কি হয়েছে? পেপারের কোনো খবর? কই কি এমন দুখের খবর দেখি? ওহ্ এই হেড লাইনটা? তাতে কি হয়েছে? পৃথিবীতে কতো কি তো ঘটে! সব খবর রাখতে হবে তোমাকে? আজ থেকে তোমার পেপার পড়া বন্ধ। পেপার ওয়ালাকে বলে পেপার বন্ধ করে দেবো কাল থেকে। আঁচল দিয়ে সৌরভের চোখ মুছতে মুছতে আদর মাখানো ধমকের সুরে কথাগুলো বলে সোমা!

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

All Rights Reserved ©2024