শনিবার, ১৮ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

লিবিয়ায় বাংলাদেশি বন্দীদের ৭৯ শতাংশই নির্যাতনের শিকার

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে যাদের লিবিয়ায় নেওয়া হয়, তাদের সবাইকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখানো হলেও বাস্তবে তা হয় না। উল্টো অধিকাংশকেই লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দী রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় অর্থ। তবে এতকিছুর পরও ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপের স্বপ্নে লিবিয়া যাওয়ার এই প্রবণতা থামছে না।

আজ শুক্রবার বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ৫৫৭ জন বাংলাদেশির যাত্রা, গন্তব্য, অর্থ, নিপীড়ন ও উদ্ধার থেকে শুরু করে প্রত্যেকের ৫০ ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে।

গত এক দশক ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়াদের মধ্যে যেসব দেশের নাগরিকরা রয়েছেন, সেই তালিকার শীর্ষ দশে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রায়ই এভাবে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত নানা দেশের ২৫ লাখ মানুষ এভাবে সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে গিয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে এভাবে যেতে গিয়ে প্রায় ২২ হাজার মানুষ সাগরে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে। এরমধ্যে অনেক বাংলাদেশিও আছেন।

ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশিরা লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে চেষ্টা করে। এটি সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই পথে অন্তত ৭০ হাজার ৯০৬ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।

এভাবে ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এভাবে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবে নয় বাংলাদেশি প্রাণ হারায়। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় আরও ২৬ বাংলাদেশিকে। তবে এরপরও এমন যাত্রা থামছে না। গতকালও লিবিয়া থেকে ১৪৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন।

গবেষণার ফলাফল

ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী লোকজন সবচেয়ে বেশি ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছেন। এরমধ্যে ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সবচেয়ে বেশি। এদের বেশিরভাগই বাড়ি মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এলাকায়।

লিবিয়া ফেরত ৫৫৭ বাংলাদেশির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ৬০ শতাংশের পরিবারকে স্থানীয় দালালেরা ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছিল। কিন্তু ৮৯ শতাংশই চাকরি বা কোনো কাজ পাননি। উল্টো নানা ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

যাত্রাপথ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে দুবাই-মিসর হয়ে লিবিয়া গেছেন সবচেয়ে বেশি মানুষ। এছাড়া ঢাকা থেকে ইস্তানবুল-দুবাই হয়ে লিবিয়া, ঢাকা থেকে কাতার হয়ে লিবিয়া, ঢাকা থেকে দুবাই-সিরিয়া হয়ে লিবিয়া এবং অল্পকিছু লোক ঢাকা থেকে সরাসরি লিবিয়া গিয়েছেন।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এভাবে লিবিয়া যাওয়ার পথে ৬৩ শতাংশই বন্দী হয়েছেন। বন্দীদের মধ্যে ৯৩ শতাংশই ক্যাম্পে বন্দী ছিলেন। পাশাপাশি বন্দীদের ৭৯ শতাংশই শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এছাড়া লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ৬৮ শতাংশই মুক্তভাবে চলাচলের স্বাধীনতা হারিয়েছেন। আর ৫৪ শতাংশই বলেছেন, তারা কখনো তিনবেলা খাবার পাননি। অন্তত ২২ শতাংশ দিনে মাত্র একবেলা খাবার পেয়েছেন।

এভাবে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার জন্য অর্থ কোথায় পেয়েছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে ৫৬ শতাংশ বলেছেন, তারা নিজেরাই এই টাকা জোগাড় করেছেন। আর ২৩ শতাংশ বলেছেন, তারা পরিবারের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়েছেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশের সব জেলার লোক কিন্তু এভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে না। মূলত শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার লোকজন এভাবে ইউরোপে যায়। আমাদের গবেষণায় এটি উঠে এসেছে যে, দালালেরা এসব এলাকার অভিভাবক ও তরুণদের ভালো চাকরি আর ইউরোপের প্রলোভন দেখাচ্ছে, যেটি বাস্তব নয়। কাজেই সাধারণ মানুষ ও বিদেশগামীদের সবার আগে সচেতন হতে হবে।’

ব্র্যাকের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এলাকার স্থানীয় দালাল ও মানবপাচার চক্রকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। বিশেষ করে অর্থের লেনদেন খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি যে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র রয়েছে লিবিয়া বা অন্য দেশে, তাদের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিকভাবে সোচ্চার হতে হবে। এছাড়া লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান- এই এলাকার স্থিতিশীলতা জরুরি। নয়তো সেখানকার মানুষজন জীবন বাঁচাতে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করবে। আর সেই সুযোগে পাচারকারীরা বাংলাদেশের মতো আরও অনেক দেশের নাগরিকদের সেখানে যুক্ত করবে। কাজেই সম্মিলিতভাবে এসব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

All Rights Reserved ©2024