
বাংলাদেশে সুলতানি আমলের টিকে থাকা প্রাচীনতম সৌধ গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর সমাধি। প্রস্তরনির্মিত ও শবাধার-সংবলিত এই সমাধিসৌধ সোনারগাঁয়ের শাহ চিলাপুরে অবস্থিত। এটি বাংলার ইলিয়াস শাহি বংশের তৃতীয় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর সমাধি বলে কথিত। পাঁচপীর দরগাহ থেকে প্রায় ১০০ ফুট পূর্বে মগদিঘি পুকুরপাড়ে এর অবস্থান। পাথরের সুদৃশ্য কবর ফলকটি মূলত কালো পাথরে তৈরি। নৌকার তলার মতো এর উপরিভাগ। অনুরূপ উপাদানে তৈরি ফলকের ওপর স্থাপিত। আগে এটি প্রস্তরস্তম্ভ দ্বারা বেষ্টিত ছিল; যা ওপরের আচ্ছাদনের ভার বহন করত। পাথরের ওপর খোদাইকর্ম দ্বারা সুশোভিত ছিল। বর্তমানে এ অলংকরণ শুধু পূর্ব পাশে দেখা যায়। সমতল ফলকের কার্নিশে পুঁতি বসানো। অলংকরণের নিচে এক সারি বিলেট সজ্জা রয়েছে। এ নকশা আদিনা মসজিদের ‘বাদশা কা তখ্ত’-এর পাথর খোদাইয়ের অনুরূপ। এর নিচে রয়েছে সারিবদ্ধ প্যানেল। মধ্যভাগ ঝুলন্ত মোটিফে সজ্জিত।
সমাধিসৌধে শায়িত ব্যক্তির শনাক্তকরণ
সমাধিতে কোনো শিলালিপি নেই। তবে দেখে মনে হয়, এটাই আদিনা মসজিদের অলংকৃত নকশার অনুসরণে টিকে থাকা সর্বপ্রথম সৌধ। স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, এটি ১৪০৯ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর সমাধি। সৌধটিকে ১৫ শতকের প্রথম দিকের বলে ধরা হয়। তখন গিয়াসউদ্দিন বাংলার সুলতান ছিলেন। স্থাপত্যশিল্পের দিক থেকে সৌধটি এ সুলতানের সময়কালের। কারণ, এতে তার বাবা সিকান্দার শাহর নির্মিত আদিনা মসজিদের অলংকরণরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। তবে প্রস্তরনির্মিত এ সমাধিসৌধে শায়িত ব্যক্তির শনাক্তকরণ সম্পর্কে মতানৈক্য রয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতির ভিত্তিতে সবাই একে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর সমাধি মনে করেন।
কেউ আবার বলেন, তাকে পাণ্ডুয়ায় একলাখী সমাধিসৌধে সমাহিত করা হয়। ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, সুলতান সিকান্দার শাহ সোনারগাঁ থেকে প্রায় ২০ মাইল পশ্চিমে সুননগর গ্রামে তার ছেলে গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। স্থানটি সাবেক ঢাকা জেলার জাফরাবাদ মৌজার বর্তমান সনগা ও কাঁটাসুরের কাছাকাছি। গিয়াসউদ্দিন এ বিয়োগান্ত ঘটনায় শোক ভারাক্রান্ত হলেও তার পরিষদবর্গের ওপর বাবার দাফনের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। সিংহাসনে তার উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাণ্ডুয়ায় যান।
অধিকতর সম্ভাব্য হলো, সিকান্দার শাহকে তড়িঘড়ি করে সোনারগাঁয়ে দাফন করা হয়। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন মহান নির্মাতা। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বী কারিগরদের পৃষ্ঠপোষক। একলাখী সমাধিসৌধ ছিল দুই শিল্পরীতির সমন্বয়। বাংলার যে প্রচলিত পোড়ামাটির অলংকরণশিল্পে হিন্দুরা দক্ষতা অর্জন করে, তা এ সমাধিসৌধে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়। প্রকৃতই এটি পোড়ামাটির অলংকরণশিল্পের একটি জাদুঘর। যেখানে ১৩ ধরনের নকশায় দেয়ালের উপরিভাগ সুসজ্জিত করা হয়েছে।
গিয়াসউদ্দিন তার প্রথম জীবন সোনারগাঁয়ে এবং পরবর্তী সময়ে গৌড়ে কাটান। সবদিক বিবেচনায় এটিই স্বাভাবিক, সোনারগাঁয়ের বর্তমান সমাধিসৌধ তিনি তার বাবার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। পাণ্ডুয়ার বিখ্যাত একলাখী সমাধিসৌধ তৈরি করেছিলেন নিজের শেষ শয্যার জন্য।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহর পরিচয়
বাংলার শাসনকর্তা সুলতান সিকান্দার শাহর বিদ্রোহী ছেলে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৩৮৯ সালে সিংহাসন দখল করেন। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ১৩৮৯ থেকে ১৪১০ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তার মূল নাম ‘আজম শাহ’। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি গিয়াসউদ্দিন নাম ধারণ করেন। তার জন্মসন সম্পর্কে জানা যায় না। বিস্তৃতির চেয়ে রাজ্যকে সুদৃঢ় করার প্রতি বেশ মনোযোগ ছিল তার। শিক্ষাক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা ও সুশাসনের জন্য সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি। আইনের প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধা। তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। কবি-সাহিত্যিক ও বিদ্বান লোকদের সমাদর করতেন। মাঝেমধ্যে আরবি ও ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তার নিয়মিত পত্রালাপ হতো। কবি হাফিজ তাকে একটি গজল লিখে পাঠান।
বাংলা সাহিত্যের উন্নতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান ছিল এ সুলতানের। তার সমসাময়িকদের মধ্যে শেখ আলাউল হক ও নুর কুতুব আলম খুব বিখ্যাত ছিলেন। তার সময়েই কবি শাহ মুহম্মদ সগির তার বিখ্যাত রচনা ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনা করেন। কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’-ও তার সময়েই বাংলায় অনুবাদ করা হয়। এ ছাড়া তিনি তার বাবা ও দাদার মতো আলেম ও সুফিদের খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। পবিত্র মক্কা ও মদিনার যাত্রীদের সহায়তা করতেন। মক্কা ও মদিনায়ও দূত পাঠান। এ দুই স্থানে ‘গিয়াসিয়া মাদরাসা’ নামে দুটি মাদরাসা নির্মাণে আর্থিক সহায়তা করেন। ১৪১১ সালে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
সমাধিক্ষেত্রের ফিলহাল-হালচাল
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯২০ সালের ২২ নভেম্বর গিয়াসউদ্দিনের সমাধিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। সর্বশেষ ১৯৮৫ সালে এ সমাধির সংস্কারকাজ করা হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সুলতান গিয়াসউদ্দিনের সমাধির পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। এতে লেখা আছে, কোনো ব্যক্তি এ পুরাকীর্তির কোনো ধরনের ধ্বংস, বিকৃতি, পরিবর্তন বা ক্ষতি করলে পুরাকীর্তি আইন ১৯৭৬-এর ১৯ ধারা অনুযায়ী এক বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। প্রথম ইলিয়াস শাহি বংশের এ সুলতানের সমাধি পরিদর্শনে সারা বছরই পর্যটকরা ভিড় করেন। ফলে বছরজুড়ে শাহ চিলাপুর পর্যটকদের পদচারণে মুখরিত থাকে। সমাধিকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছে। ইতিহাসচর্চায়ও মনোনিবেশ করছে মানুষ। নতুন প্রজন্ম বাংলার ইতিহাস ও শাসকদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।