
নানা চাপ, আন্দোলন ও নাটকীয়তার পর গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৯শে আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে। প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৫শে আগস্ট। আর ভোটগ্রহণ হবে ৯ই সেপ্টেম্বর।
ডাকসু নির্বাচনে কোন কোন ছাত্র সংগঠন এ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং কারা সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারেন, তা নিয়ে ক্যাম্পাসের রাজনীতি সচেতন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। নানা হিসাব কষছে, প্রার্থী ও ভোটাররা। ২০১৯ সালের ডাকসু’র নির্বাচনের বিষয়গুলোও মাথায় রাখছে ক্যাম্পাস রাজনীতির অংশীজন। কারণ, সে বারের ডাকসু নির্বাচন থেকে ওঠে আসা নেতারাই বড় প্রভাবক ছিলেন ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে। এ হিসাব মাথায় রেখেই দৌড়ঝাঁপ চলছে সংশ্লিষ্টদের।
ভোটযুদ্ধে নামবে যারা: ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সকল ছাত্র সংগঠনই তাদের নিজ নিজ প্রার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত। দলীয় ব্যানার-বলয়ের বাইরেও আছেন একাধিক প্রার্থী, একাধিক প্যানেল। শিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ প্রার্থী দিতে পারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে। ডাকসুতে এবার ২৮টি পদে নির্বাচন হবে। সবশেষ, ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ২৫টি পদে নির্বাচন হয়েছিল।
ছাত্রদলের ডাকসু প্যানেল দলীয় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। তবে ঢাবি’র জসীম উদ্দীন হলের প্রচার সম্পাদক তানভীর বারী হামীমের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে ক্যাম্পাসে। ছাত্রদলের এই নেতা আসতে পারেন বড় পদে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সম্পাদক পদে আবিদুর রহমান মিশু, মল্লিক ওয়াসী তামী, আবিদুর রহমান খান, সাইফ খান, আনিসুর রহমান খন্দকার আনিক, আনিক হাসান, মেহেদী হাসান খান, ওবায়দুল্লাহ রিদওয়ানকে নিয়ে ভাবছে সংগঠনটি। তবে বয়সসীমার বাধ্যবাধকতা ওঠে যাওয়া ও সান্ধ্যকালীন কোর্স সংক্রান্ত শর্তের কারণে সিনিয়র নেতাদের ডাকসু নির্বাচনের সম্ভাবনা প্রবল। বিভিন্ন সূত্রমতে, এ নিয়ে সংগঠনটির সিনিয়র ও জুনিয়র নেতাদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এদিকে, ডাকসুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে ওঠে আসা সমন্বয়কদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) প্রার্থিতাও স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার, সদস্য সচিব জাহিদ আহসান ও মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদাসসির চৌধুরী প্রার্থী হতে পারেন। ভিপি পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের থাকার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদগুলোতে রাফিয়া রেহনুমা হৃদি, মহির আলম, আল আমিন সরকার আসতে পারেন। ভিন্নভাবে হিসাব কষছে ১১ বছর পর ক্যাম্পাসে সক্রিয় হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির নেতাদের সবাই নির্বাচন করবেন না বলে সংগঠনসূত্রে জানা গেছে। ভিপি পদে নির্বাচন করতে পারেন সাবেক সভাপতি সাদিক কায়েম কিংবা বর্তমান সভাপতি এসএম ফরহাদ। এ ছাড়াও নারী প্রার্থীও প্যানেলে থাকবে বলে সংগঠনসূত্রে জানা গেছে। এমনকি থাকতে পারেন অমুসলিমরাও। এক্ষেত্রে সমমনা ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে জোট হতে পারে সংগঠনটির।
বাম ঘরানার সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনো কোনো সংগঠন ডাকসুতে প্রার্থীই দেবেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বাম সংগঠনগুলোর মোর্চা সংগঠন গণতান্ত্রিক বাম জোটের পক্ষ থেকে কেবল কেন্দ্রীয় ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে। হলগুলোতে প্যানেল দেয়ার কথা ভাবছেন না তারা। বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মধ্যে মেঘমল্লার বসু, মোজাম্মেল হক, সীমা আক্তার, জাহিদুল ইসলাম রিয়াদ, আরমানুল হক, জাবির আহমেদ জুবেল ভিপি, এজিএস, জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো থেকেও আসতে পারে প্রার্থিতা।
এদিকে, সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী, অরাজনৈতিক স্বতন্ত্র প্যানেল গঠিত হতে পারে ক্যাম্পাসে সক্রিয় সাবেক সমন্বয়ক ও জুলাই ঐক্যের সংগঠক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের নেতৃত্বে। এতে থাকতে পারেন, এবি জুবায়ের, মাহমুদ রিদওয়ান, আব্দুর রহমান আল ফাহাদসহ সাবেক সহ সমন্বয়কদের একাংশ। জোটবদ্ধ নির্বাচন করতে পারে সর্বশেষ ডাকসুতে বিজয়ী প্যানেল ছাত্র অধিকার পরিষদ। তবে কার সঙ্গে জোট হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। সংগঠনটির সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা হবেন ভিপি প্রার্থী। এদিকে, সমপ্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র পদ থেকে পদত্যাগ করা উমামা ফাতেমা ভিপি পদে নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে। একই প্ল্যাটফরমের নবনির্বাচিত সভাপতি রিফাত রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমাম শীর্ষ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির বর্তমান সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আছেন।
তবে, দলমত নির্বিশেষে হল সংসদগুলোকে ঘিরে ঢিলেঢালা হিসাব কষছে সংগঠনগুলো। এক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ১৭ই জুলাই থেকে যারা ছাত্রলীগকে হটিয়ে হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তারা আসতে পারেন হল সংসদের নেতৃত্বে। এক্ষেত্রে দলীয় চিন্তা না থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
ডাকসু ঘিরে যে অবস্থান সংগঠনগুলোর: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি, আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের বিচার প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহিষ্কার কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এগুলো রেখে তফসিল ঘোষণা কতোটুকু বাস্তবায়ন হবে, সেটা নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, এ ছাড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ডাকসু’র সভাপতি হন ভাইস চ্যান্সেলর। আর হলে হন প্রভোস্ট। তারা চাইলে কমিটি ভেঙে দিতে পারবেন এবং কাউকে বহিষ্কারও করতে পারবেন। কিন্তু এরা কেউ নির্বাচিত নয়। আমরা বলেছিলাম, তাদের নির্বাচিত হতে হবে। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদাসসির বলেন, আমাদের ইচ্ছা একটি শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীরা যেন কখনো আর জিম্মি না হয়, তার ব্যবস্থা আমরা করবো। আমাদের কাজ হবে ক্যাম্পাসকে আরও গতিশীল করা। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটভুক্ত সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে সর্বজনগ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন চাই। অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে কেউ যেন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে, এ বিষয়ে প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সেক্রেটারি মহিউদ্দিন খান বলেন, আমাদের প্যানেল তৈরির কাজ চলমান আছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা প্যানেল সামনে নিয়ে আসবো। নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই অংশগ্রহণ করবেন। তবে, নেতৃবৃন্দের বাইরেও যারা জুলাই আন্দোলনসহ ক্যাম্পাসের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন তারাও প্রার্থী হবেন।