শনিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ইসরাইল

প্রথম ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘বৈরুতের কসাই’ নামে পরিচিত অ্যারিয়েল শ্যারন ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত সফর করেন। তার এই সফর ছিল বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন বন্দোবস্তের সূচনা এবং এই বন্দোবস্তের নাম হলো ‘ইন্দো-ইসরাইল সম্প্রসারণবাদ’। শ্যারনের সফরের সময় ভারতে ক্ষমতায় ছিল অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। দুই দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে শ্যারন ও বাজপেয়ী যৌথভাবে ঘোষণা দেন, ইসরাইল ও ভারত অভিন্ন সন্ত্রাসবাদ দ্বারা জন্ম থেকেই আক্রান্ত এবং তাদের একসঙ্গে এই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে হবে। তারা একমত, দুই দেশেরই চারপাশে শত্রুরাষ্ট্র। অতএব ভারত ও ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেশ দুটি পৃথিবীর কোনো আইনকানুনকেই পরোয়া করবে না, এমনকি মানবাধিকারের সর্বজনীন নীতিও নয়।

এই ‘সিকিউরিটি স্টেট’ ডক্ট্রিন দিয়েই মূলত ভারত ও ইসরাইল তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোয় রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ করার শর্ত তৈরি করে। তাদের এই অভিন্ন শত্রু হল ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব। ইসরাইলের পাশে ফিলিস্তিন ও অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র এবং ভারতের পাশে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। ইসরাইল যেমন ‘প্রমিসড ল্যান্ড’ বলে সম্পূর্ণ ফিলিস্তিন দাবি করে, তেমনি ভারতও মহাভারতের গল্প ফেঁদে আফগানিস্তানসহ সমগ্র উপমহাদেশ তাদের বলে দাবি করে।

ভারত ও ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয় যথাক্রমে ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় অবস্থানে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী ইহুদিদের দাবি ন্যায়সংগত মনে করলেও ধর্মীয় ও শর্তের বাধ্যবাধকতায় ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ভারত ফিলিস্তিনকে ভাগ করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এবং পরে দেশটির জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের বিরোধিতা করে।

কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছিল। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে রাজনৈতিক ও নৈতিকতার বিচারে সঠিক মনে করেছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার। ভারত জাতিসংঘে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ভোট দিলে সাভারকার এর নিন্দা জানান। উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) অন্যতম প্রধান নেতা মাধব সদাশিব গোলওয়ার বলেছিলেন, ফিলিস্তিনই ইহুদিদের আদি বাসস্থান।

জন্মের পর থেকেই ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে চিরশত্রু জ্ঞান করেই এসেছে এবং কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে প্রথম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ১৯৪৭ সালে। প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধই মূলত ইসরাইলকে সুযোগ করে দেয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মাধ্যমে তৎকালীন নেহেরু সরকারকে চাপ দিয়ে স্বীকৃতি আদায়ের এবং পরে সেটাই ঘটে। ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে ভারত স্বীকৃতি দেয় ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৭ সালের পরের প্রতিটি পাক-ভারত যুদ্ধে ইসরাইল নিঃশর্তভাবে ভারতকে সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দেয়। এর ফলে ভারতজুড়ে ইসরাইলের কাজ করা সহজ হয়ে যায়।

ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জন এবং বোমা তৈরিতে ইসরাইল প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহযোগিতা দিয়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই তেল আবিব দিল্লির সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হয় এবং যৌথভাবে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। ইসরাইল ভারতকে পাকিস্তানে আক্রমণ করে পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে বলে এবং এ কাজে ভারতকে সব ধরনের বৈমানিক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাসও দেয়। কিন্তু এই আক্রমণের পরিণতি বিবেচনা করে ভারত শেষ মুহূর্তে পিছু হটে।

১৯৯৮ সালে পাকিস্তান পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় এবং একই বছর অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় আসে। বিজেপির অন্যতম দুই শীর্ষ নেতা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিং প্রথম ভারতীয় মন্ত্রী হিসেবে ২০০০ সালে ইসরাইল সফর করেন। তাদের সফরেই মূলত ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের রূপরেখা প্রণয়ন এবং যৌথ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কমিশন গঠন করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক পাকাপোক্ত করা হয়। যদিও ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯২ সাল থেকেই ভারত ও ইসরাইল আনুষ্ঠানিক পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু করে।

মতাদর্শিক কারণে ইসরাইলের লিকুদ পার্টি এবং ভারতের বিজেপি তাদের সম্পর্কের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের এই সম্পর্ককে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য প্রথমত ইসরাইল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে লিকুদ পার্টিকে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে হয়েছে, একই সঙ্গে বিজেপিকেও ভারতের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই শক্তিশালী হতে হয়েছে। বিশ্লেষকরা একমত, লিকুদ পার্টি ইসরাইলের ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রক্ষমতা এবং তার বৈশ্বিক যোগাযোগকে ব্যবহার করে ভারতে বিজেপিকে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত করার জন্য যাবতীয় চেষ্টা চালিয়েছে। উদ্দেশ্যটা সহজেই অনুমেয়, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে আরেকটি ইসরাইল রূপে প্রতিষ্ঠিত করা।

দক্ষিণ এশিয়া ভূ-রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ভরকেন্দ্র। ভূ-কৌশলগত যোগাযোগপথের জন্যই কেবল এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় ৫০ কোটির মুসলিম, মধ্য এশিয়া হয়ে রাশিয়ায় ঢোকার প্রবেশদ্বার আফগানিস্তানের মুসলিম শক্তি এবং ইসরাইল রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা ইরান ইসরাইলের মাথাব্যথার কারণ। এ কারণে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংস করার হাতিয়ার বানানো জায়নবাদী ইসরাইলের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত হয় ভারত। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে অস্বীকার করে। চিরবৈরী পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ায় তাদের মোকাবিলার জন্য ভারতের বিশেষ কৌশল ও শক্তির প্রয়োজন হয়। এ বিষয়টাকে পুঁজি করেই ইসরাইল ভারতকে নিরঙ্কুশ সহযোগিতা করার অবস্থান নিয়ে ‘ইন্দো-ইসরাইল সম্প্রসারণবাদ’কে ডিপ স্টেট নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ইন্দো-ইসরাইল সম্প্রসারণবাদের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ২০১৪ সালে ‘গুজরাটের কসাই’ নামে পরিচিত বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদির ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে। মোদিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে এলকে আদভানি ও সুব্রামনিয়াম স্বামীর মতো নেতাদেরও বিজেপিতে অপাঙ্‌ক্তেয় করা হয়েছে। মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে তার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে যে মুসলিম গণহত্যা চালানো হয়েছিল, সেটা ছিল একটা টেস্ট কেস। গুজরাটের মুসলিম গণহত্যার ঘটনাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এতটাই ভারতকে চাপে ফেলেছিল যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী পর্যন্ত মোদির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কিছুই করতে পারেননি, কারণ মোদির পেছনে ছিল সেই ইন্দো-ইসরাইল সম্প্রসারণবাদ প্রকল্পের ডিপ স্টেট। সুতরাং মোদির বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠতে আর কোনো বেগ পেতে হয়নি।

২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরাইল সফরের মাধ্যমে মোদি ভারত-ইসরাইলের সম্পর্ককে ইস্পাতকঠিন রূপ দেন। এই সফরেই ভারত-ইসরাইল সামরিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে যে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেন, তাতে বলা হয়, ভারত পরনির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে আত্মনির্ভরশীল সামরিক শিল্প গড়ে তুলবে এবং এক্ষেত্রে ইসরাইল শুধু সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে নয়, বরং সামরিক প্রযুক্তিরও হাতবদল করবে ভারতের সঙ্গে। ইন্দো-ইসরাইল সম্প্রসারণবাদের ডিপ স্টেটের মূল লক্ষ্যই ছিল ভারতকে ইসরাইলি সামরিক শিল্পের বাজার বানানো এবং যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অস্ত্রবাজার তৈরি করা।

প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদির ইসরাইল সফরের পর ভারত ইসরাইল থেকে কেনা বিভিন্ন গোয়েন্দা নজরদারি ও ইন্টারসেপ্টর মেশিনারি স্থাপন করে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তে। ইসরাইলি নতুন এসব সামরিক সরঞ্জাম চীন সীমান্তে স্থাপনের পর যখন বেইজিং তা জানতে পারে, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। চীন যুদ্ধ ঘোষণা করে সীমান্ত থেকে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকা দখল করে।

ভারতের হিন্দু পুঁজি মূলত ইসরাইলি পুঁজির উপজাত। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ভারতে যে হিন্দু পুঁজিপতির অলিগার্ক শ্রেণি গড়ে তুলছে, তা সম্ভব হয়েছে ভারতের জনগণের কাছ থেকে লুট করা টাকা ও দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরাইলি পুঁজির সমন্বয়ের মাধ্যমে। চলমান হামাস-ইসরাইল যুদ্ধে ভারত ইসরাইলকে গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ইসরাইলের এক কূটনীতিক। তিনি বলেছেন, কারগিল যুদ্ধে ভারতকে সামরিক ও যোগাযোগ সরঞ্জাম দিয়েছিল ইসরাইল, যার প্রতিদান হিসেবে ভারত ইসরাইলকে এবার গোলাবারুদ সরবরাহ করে অকৃত্রিম বন্ধুর পরিচয় দিয়েছে। ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস, শিবসেনা ও বজরং দল থেকে অনেক স্বেচ্ছাসেবী গাজায় ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধ করছে।

ভারত তার পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ১৮০ ডিগ্রি টার্ন নিয়েছে এবং ক্ষেত্রগুলো হলো ভারতের প্রতিবেশী দেশ ও ইসরাইলের শত্রুরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। ভারত ইসরাইলের ‘ওয়েস্ট ব্যাংক মডেল’ বাংলাদেশে প্রয়োগ করতে তৎপর। কারণ এটাই তার ইসরাইল হয়ে ওঠার পরীক্ষা। ইসরাইল নামের জায়নবাদী বিষফোড়ার যন্ত্রণায় কাতর মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো মুসলিম বিশ্ব। হিন্দুত্ববাদী ভারতের মতো আরেকটি বিষফোড়ার যন্ত্রণা মুসলিম বিশ্ব কি সহ্য করতে পারবে?

লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০