অনুরাধা

কবিঃ আফতাব মল্লিক

বিয়ের প্রথম রাতেই তুমি বলেছিলে-
“কালো মেয়ে আমার পছন্দ না।
তাছাড়া তোমাকে বিয়েটা আমি নিজের অমতেই করেছি।
শহর থেকে গ্রামের বাড়ি আসার আগে পর্যন্ত আমি জানতাম না-
বাবা মা আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য ডেকেছেন।
তাও আবার তাদের আগে থেকে পছন্দ করা মেয়ের সাথে।
ওদের কথা রাখার জন্য আর সবার মান সম্মানের কথা ভেব-
আমি আর ঝামেলা করিনি।
বিয়ে করে তোমাকে নিয়ে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছি।
আর একটা কথা-
আমার গার্লফ্রেন্ড আছে‌ তাকে বিয়েও করবো।
তাকে সব জানিয়েছি। আর বলেছি যে-
এক মাসের মধ্যে তোমার কোন একটা দোষ দেখিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দেবো। ও রাজি হয়েছে।
আর হ্যাঁ এখানে তোমাকে সবার অলক্ষ্যেই থাকতে হবে।
আমার রুমে কেউ এলে, তাদের সামনে বেরোবে না।
এখানে সবাই জানে আমার বিয়ে হয়নি।”
বিয়ের প্রথম রাতে এমন কথাগুলো শুনে আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম।
শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আমার বাবা-মায়ের মুখ দুটো।
নিজের জন্য মনে হয়নি কিছুই।
এক সাগর কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠছিল বুকে।
তাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে ভেবে!
অনেকক্ষণ কাঁদার পর যখন বুঝলাম-
আমার কান্না মোছার কেউ নেই –
বুকে সাহস নিয়ে তোমাকে বললাম –
আমাকে তুমি এক বছর তোমার কাছে থাকতে দাও।
আমার বাবা-মাকে এত বড় দুঃসংবাদটা আমি এখনই দিতে চাই না।
তারা সহ্য করবে কী করে !
তুমি বললে, একবছর দিতে পারব না।
পায়েল হয়তো অতদিন অপেক্ষা করবে না।
বড়জোর চার ছ মাস দিতে পারি।
আর হ্যাঁ। আমার রুমে একজন অপরিচিত যেভাবে থাকে-
ঠিক সেভাবেই থাকবে ।তোমার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
আমি কান্না ভেজা গলায় বললাম, আচ্ছা।
তারপর প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত, আমার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল!
আমি ভুলে গেলাম সকালটা দেখতে কেমন!
কিভাবে দুপুর গড়ায়, রাত কাটে!
ঘরের প্রতিটি কোণে, রান্নাঘরে, বারান্দায় আমার চোখের জল লেগে আছে।
আমি যেন আকাশের খসে পড়া কোন উল্কা!
যার পড়ে যাওয়ার শব্দ হয় না।
আর যারা পড়ে যাওয়া দেখে তারা আনন্দিত হয়।
কোনদিন বোঝার চেষ্টা করে না-
কত ব্যথা বুকে নিয়ে উল্কাটা ঝরে পড়ছে, তার চির চেনা আকাশ থেকে!
আমার সামনে একই ঘরে থেকে-
তুমি যখন তোমার বান্ধবীর সাথে হেসে গড়িয়ে পড়তে কথায় কথায়-
খুব মরে যেতে ইচ্ছে হতো !
কিন্তু সেই বাবা-মায়ের মুখ ভেসে উঠতো চোখের পাতায়।
নিজেকে সেই আসামি মনে হতো-
যার আত্মহত্যার আবেদনও মঞ্জুর হয়না বিচারকের কাছে!
বিয়ের দু মাস পর অফিস ফেরার পথে তোমার অ্যাক্সিডেন্ট হল!
আমি অনেক কেঁদেছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কার জন্য কাঁদছি‌। তোমার জন্য না নিজের জন্য।
দুদিন পর তোমার যখন জ্ঞান ফিরলো-
তুমি প্রথম ফোনটা পায়েলকেই করেছিলে।
তারপর তুমি হুইলচেয়ারে আর আমি তোমার পাশে।
রাতদিন খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ভুলে শুধু তোমারই সেবা করেছি।
তোমার একটা পা হাঁটু থেকে কেটে দিতে হবে শুনে-
পায়েল গত চারদিন তার ফোন বন্ধ করে রেখেছে।
তোমার কষ্ট আমি বুঝতে পারছিলাম! তোমার উদাস মুখটা দেখে!
তুমি জেনে গিয়েছিলে , একটা পঙ্গু মানুষকে নিয়ে পায়েল সংসার করবে না।
এক্সিডেন্ট এর পর কেটে গেছে সাত মাস!
আজ আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের দিন!
তুমি হুইল চেয়ার ছেড়ে একা একা হেঁটেছো।
সৃষ্টিকর্তা দয়া করেছেন।
তোমার পা কেটে বাদ দিতে হয়নি।
বিকেলে আমি জানালার পাশে বসে আছি আনমনে ! আমার চোখ দুটো ভেজা।
তুমি পেছন থেকে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললে-
অনুরাধা, তুমি আমার কাছে একটা ঝরে পড়া উল্কা!
যার আলো দেখে আনন্দ পাই নি আমি! শুধু ঝরে পড়ার কষ্টটা বুঝতে চেয়েছি গত সাত মাস ধরে!
আমিও তোমার ঝরে পড়ার পথে চির সাথী হতে চাই !
শুধু তোমার কষ্টগুলো মোছার জন্য ! ক্ষমা করবে আমাকে?