‘ইট’স ওকে মা!

                কবিঃ এইচ বি রিতা (যুক্তরাষ্ট্র)

স্কুলের ব্লু কার্ড থেকে বাবার নামটা বাদ পড়ায়
সেদিন ছেলের চোখে দেখেছিলাম রাজ্যের বিস্ময়।
যতটা বিস্ময় চোখ ধারণ করতে পারে,
তারও অধিক।
সেদিনের আকাশটাও ছিল ভীষণ মেঘাচ্ছন্ন
বৃষ্টি ছিলনা,
তবে খর আর্দ্র বায়ু বয়ে যাচ্ছিল।

তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে শূন্যতা নিয়ে
বুকের ভিতরটায় কিছু ভাঙন টের পাচ্ছিলাম
কিছু সংশয়,
বলা যায় কিছু অপরাধবোধ কুড়ে খাচ্ছিল ভিতরটা।
সামনে ছিল তখন গাঢ় ‌অন্ধকার একটা দেয়াল
সে দেয়ালে আটকে পরা মাত্র পাঁচ বছর পুরনো;
নিষ্পাপ দুটি চোখ।
নরম হাতটিতে চুমু খেয়ে বলেছিলাম,
আর ইউ ওকে মা?
বলেছিল ছেলে, ইট’স ওকে মা।

তখন ইতিমধ্যেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে
গাছের ডাল-পালা, জানালায় কাঠের পাল্লা সব
শব্দ করে নড়তে শুরু করেছে
বুকের ব্যথা থেমে থেমে খুব বেড়ে যাচ্ছিল
রাতভর ঘুমন্ত ছেলের চুলে বিলি কেটে,
খুব কেঁদেছিলাম।
বুঝতে পারছিলাম, কিছুই ঠিক ছিল না
ঠিক থাকার; কথাও নয়।

হিসাব মিলিয়ে কে পেরেছে জীবনকে টেনে নিতে?
পথে হেঁটে যাওয়া পথিক যেতে যেতে ছুঁয়ে দেখে বৃক্ষরাজি,
সবুজের সমারোহে কচি পত্র-পল্লব
রং মিশিয়ে প্রকৃতির সাথে খোঁপায় গুঁজে দেয় গোলাপ ফুল।
চিত্তাকর্ষণে মুগ্ধতা নিয়ে জেনে নেয় জীবন বড় সুন্দর;
বেঁচে থাকা প্রাপ্তির অভিলাষ।
একই পথে হেঁটে যাওয়া ভিন্ন পথিক,
খুঁটিয়ে দেখে জীবনের বৈরিতা।
ছুঁয়ে দেখে ঝরে পড়া পাতা কেমন বিরহ শোকে;
বিছিয়ে থাকে বৃক্ষতল জমিনে।
এখানেই তো জীবন সমীকরণে ব্যর্থতার ছাপ রেখে যায়।

বলছিলাম মেঘের আস্তরণে সূর্য কেমন করে লুকিয়ে যায়;
তার কথা।
বুকের পাঁজরে বহমান নদী, সেখানে এক অভিমানী জীবনপঞ্জি
ভেঙে গেলে মন-ভেঙে গেলে ঘর
পাশের বালিশটিও শূন্য হয়ে পরে!
অবেলায় ছাদহীন ঘরে সেদিন মনে হয়েছিল,
ভেসে যাচ্ছি
অনেকটা যেন অথৈ সাগরে সাঁতার না জানা দুটি
আহত মানুষ, কিংবা প্রাণি
বিলগুলো জমা ছিল মাসের পর মাস
আলো বন্ধ হয়েছিল ঘরে
সবশেষে, ঘরের দরজায় ঝুলেছিল তালা।

ছোট শিশু ছেলেটি অনিরাপদ-প্রতিকূলতায় সেদিন,
থরথর করে কাঁপছিল
প্রয়োজনেরও বেশি চাপ দিয়ে হাতটি ধরেছিল আমার
বুঝে গিয়েছিলাম ততক্ষণে, যুদ্ধের ময়দানে আছি
হিসাব-নিকাশের সামান্য ভুলেই
প্রতিপক্ষ ঢুকে পড়তে পারে আমার ছোট রাজ্যে।
এখন কেবল কেন্দ্র দখল করা; কৌশলে
সে কেন্দ্র দখলে চাই সৈন্য
হাতি, ঘোড়া, মন্ত্রী নয়;
প্রতিপক্ষের রোধে সৈন্যকে এগোতে চাই স্পর্শ, মমতা;
ভালবাসাময় একটি উন্মুক্ত মাঠ।
আর সেই সৈন্যটি ছিল-আমার শিশু সন্তান।

বাবার কাঁধে ঘোড়ায় চড়া শিশুটি সেদিন বুঝতে পারেনি,
বাবার হাত ধরে আর কখনোই তার পার্কে হাঁটা হবে না।
বুঝতে পারেনি,
টিফিন বক্স হাতে কেবল মা’ই তার জন্য,
দৃশ্যমান হবে।
বাস্তবতা বড় কঠিন, বড় নির্মম
প্রাপ্তির সাথে সময় সব বদলে দেয়, কেড়েও নেয়।
এতকিছু বুঝার মত বয়সও তার ছিল না।
তবে কষ্টটুকু ঠিকই হয়তো দলা পাকিয়ে বসে ছিল বুকে।

কত বাবা সন্তানের খোঁজ নিতে স্কুল মিটিংয়ে গেল
কত শিশু বাবার হাত ধরে হেসে কুটিকুটি হল,
রেস্টুরেন্টে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পিজা-বার্গার খেলো
ঈদ উৎসবে কতজন নতুন কাপড় কিনে দিল,
প্রিয় সন্তানকে।
শুধু আমার শিশুটি চেয়ে চেয়ে দেখে গেল।
অভিযোগ করেনি কখনো;
অভিমান যে ছিল, তা বেশ জানি।
বুকের ভিতরের ব্যথা কি আমার টুঁটি চেপে ধরেনি সেদিন?
ধরেছিল! এখনো ধরে।

প্রতি বছর ব্লু কার্ডের শূন্যস্থানটি তাকে কষ্ট দিত বলে
কলমের কালিতে প্রতিবারই সেটা ঢেকে দিতাম।
যা চিরসত্য ভাসমান, তা কি লুকানো যায়?
ছেড়ে গেলে, ফেলে দিলেই কি রক্তের দাগ মোছা যায়?
একদিন বলেছিলাম তাকে,
মা! খুব কষ্ট পাচ্ছো! তাই না?
মিষ্টি হেসে বলেছিল, একদম না!
বলেছিলাম, সবটুকু দিতে পারছি না যে!
জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আই লাভ ইউ মা!
বুকের ব্যথাটা সেদিন আবারো ফুঁসে উঠেছিল
বুঝতে পারছিলাম, কিছু লুকানো হচ্ছে।
বলেছিলাম আমিও, লাভ ইউ টু মা।

এভাবেই তো সব সয়ে যেতে হয়
দায়বদ্ধ জীবনে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ছার দিতে হয়
এভাবেই বুকের ভিতর কবর খুঁড়ে কষ্ট লুকাতে হয়।

পড়াশুনায় ছেলে আমার বরাবরই ভাল
সেদিন সর্বোচ্চ ফলাফল ঘোষণায় স্কুল থেকে
‘বারাক ওবামা’ সনদ পেয়েছিল সে।
আরো দু’টি শিশু ছিল সনদ হাতে, বাবা-মায়ের পাশে
শুধু তার ছিলাম- ‘আমি!’
চোখ লুকিয়ে বাবাকে খুঁজছিল সে স্কুল অডিটোরিয়ামে
আমি ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম
বলেছিলাম, আর ইউ ওকে মা?
হাসি মুখে বলেছিল, আই এ্যাম ওকে মা।
হয়তো টের পেয়েছিল আমার উৎকন্ঠা
তাই জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
‘মা! ইউ আর দ্য বেষ্ট মা এভাব।’

হ্যাঁ! ছেলেকে আমি তার নাম ধরে ডাকিনা
মা বলে ডাকতেই ভাল লাগে বেশ!
আমাদের মা ছেলের অদ্ভুত সব কণ্ঠে ডাকাডাকি-
খুনসুটি, ভাগাভাগি
এ এক অদ্ভুত রকমের বাক্সবন্দী সুখ;
যা কেনা বেচা হয় না, শুধু উপভোগে থেকে যায়।

তাল-লয় না জানা মানুষ কেন জেগে উঠে প্রতি মধ্যরাতে
কতটা নিষ্ঠুরতায় বালিশ চেপে ধরে মুখে,
তা হয়তো আমরা সবাই, সবটুকুই জানি।
অনিয়ন্ত্রিত দহন যখন নিঃশ্বাস চেপে রাখা বুকে
করুণ গোঙানির সুর তুলে
জীবনের হিসাব তখন সবটুকুই বদলে যায়।
ব্যাকরণ, যোগ-বিয়োগের ফলাফল সবই গড়মিল হয়!
তবু হিসাবের দাঁড়িপাল্লায় দাঁড়াতে হয় দায়বদ্ধতা থেকে।

এভাবেই দিনগুলো পার হয়
রাত আসে আঁধার নিয়ে, আবারো ভোর হয়
তারপর সপ্তাহ, মাস, বছর অতপর এক যুগ!
গতকাল যে শিশুটি ছিল অবুঝ,
সে আজ কিশোরে পরিণত হয়েছে।
আজ সে হিসাব বুঝে
বিনিময় লেনদেন সব বুঝে।
নিষ্ঠুর বাস্তবতায় কেমন করে খাপ খাইয়ে ভাল থাকতে হয়,
তাও সে জানে।

স্কুলের ব্লু ইমার্জেন্সি কার্ডে বাবার শূন্যতা
এখন আর তাকে লুকানো বেদনায় ছুঁড়ে ফেলে না।
আজ যখন তার জিম ক্লাসে জরুরি যোগাযোগের কার্ডটি
পূরণ করতে গেলাম,
অভিভাবকের জায়গায় বাবার নাম চাওয়া হল!
হাসি মুখে ছেলে বলল, ‘আই ডোন্ট হ্যাভ এ্যা ড্যাড!’
বিস্ময় ভরা চোখ দু’টো নিয়ে তাকালাম তার দিকে
বুকের ভিতর সেই পুরানো কিছু আবারো ভাঙতে শুরু করলো
টের পেলাম
দলা পাকিয়ে কিছু একটা গলার শ্বাসনালী বরাবর চলে এসেছে।
শক্ত করে ছেলের হাতটি ধরলাম!
কিছু বলার আগেই এক ‌অদ্ভুত রকমের মিষ্টি হাসিতে
ছেলে আমাক জড়িয়ে ধরে বলল,
‘ইট’স ওকে মা!