তুমি বাবার এ ফুলটি উপহার হিসাবে গ্রহণ করো

            লেখকঃ অধ্যাপক আব্দুস সহিদ খান

রাতের খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে যখন বিছানায় এসে বসলাম তখন পৌনে এগারটা বাজে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম তিনটে মেসেজ এসেছে। তিনজনই ফেসবুক ফ্রেন্ড। শুভরাত্রি জানিয়েছে। তিনজনকেই শুভরাত্রি জানিয়ে মেসেঞ্জার বন্ধ করার আগে চোখে পড়ল মেসেঞ্জারের বাঁ দিকের কোনে নিজের ছবির উপর লাল চিহ্ণ। অপরিচিত কেউ মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। অর্থাৎ যে পাঠিয়েছে সে বন্ধু মানে ফেসবুক ফ্রেন্ড নয়।

খুলতেই দেখলাম, যে পাঠিয়েছে তার নাম সবুজপাতা। তার ছবি যেটা ফেসবুকে দিয়েছে সেটা দুটো সবুজ রঙের পাতা। লেখাটায় হাই, হ্যালো কিচ্ছু নেই। তার বদলে সোজাসুজি প্রশ্ন এবং বাংলায়, যদিও ইংরেজী অক্ষরে – “তুমি আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এ্যাকসেপ্ট করনি কেন?”

বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে গেল আমার। আমি ইংরেজী দিয়ে বাংলা লেখা আদৌ পছন্দ করি না। আমার মতে – হয় বাংলা লেখো, নয় ইংরেজী, বাংরেজী নয়। আমি বলি হ্যাট কোট পরানো বাংলা। তার উপর, চিনি না শুনি না, সোজাসুজি তুমি করে কথা বলছে। সাধারণ ভদ্রতা বোধ নেই। পঞ্চাশ পেরিয়েছি তিন মাস আগে। কোনদিনই চ্যাংড়ামি পছন্দ করি না।

একটু আধটু লেখালেখি করি। বইয়ের লেখকদের পাশাপাশি ফেসবুকের কয়েকজন সাহিত্য লেখকদের সাথে পরিচিতি আছে। যারা আমার ভার্চুয়াল বন্ধু আছেন তাদের বেশিরভাগই আমার ব্যক্তিগত জীবনে পরিচিত। সামান্য কজন বাইরের লোক হলেও এখন প্রায় সকলেই পরিচিত হয়ে গেছেন। তারাও কিন্তু বিশিষ্ট এবং প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক। পাঁচ হাজারের লিমিট থাকায় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এ্যাকসেপ্ট করার সুযোগ নাই। লক করা প্রোফাইল, ছবি না থাকলে তো সরাসরি ডিলিট করে দেই। কে এটা? প্রোফাইলটা দেখতে গেলাম। প্রোফাইল লকড।

প্রথমে ভাবলাম, কোন উত্তর দিবো না। তারপরেই ভাবলাম ঘুম তো ইদানিং চট করে আসে না। যেই হোক, এর সঙ্গে গ্যাঁজানো যাক। না এটাকে আপনি বলার কোন দরকার নেই। আমি বাংলা লিপিতে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। শুরু করলাম–
“তুমি কে?”
“আমি সবুজপাতা।“
“সে তো দেথতেই পাচ্ছি, তা তুমি কি নারী? না পুরুষ? না উভলিঙ্গ?”
“না, আমি একজন মেয়ে।“
“তা তোমাকে কি খুব বিচ্ছিরি দেখতে? কালো? গাল ভর্তি ব্রণ আছে নাকি?”
“না না তা নয়।“
“তবে তোমার ছবি দাওনি কেন?”
“এমনিই দিইনি। যদি কেউ বন্ধু হয়, যদি সে চায় তাকে ছবি দেব।“
“বাঃ খুব ভাল কথা। কিন্তু দরজা বন্ধ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকলে কেউ তোমার বন্ধু হবে কেন?”
“তুমি তো আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এ্যাকসেপ্ট করনি।“
“আমার মনে পড়ছে না। তবে ছবি না থাকলে, প্রোফাইল লক থাকলে আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এ্যাকসেপ্ট করি না। একদমই না। তা ছাড়া তোমাকে আমি কি কারণে বন্ধু বলে স্বীকার করব?”
“তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে।“
বিস্মিত হলাম। “আমাকে ভাল লাগে মানে? তুমি কি আমাকে চেন নাকি? কোথাও দেখেছ?”
“না না, তোমার লেখা আমার খুব ভালো লাগে, তাই। কি সুন্দর লেখ তুমি।“
“আমার লেখা ভালো লাগে বলে তুমি আমার বন্ধু হবে? লেখা সুন্দর হলেই কি মানুষ সুন্দর হয়?”
“না, তুমি খুব ভালো। তা নাহলে কেউ এত ভালো লিখতে পারে না।“
“তোমার বয়েস কত? কি কর?”
“আমার বাইশ চলছে, কলেজে পড়ি।“
“খুব ভালো কথা। আমি তোমার বন্ধুত্ব স্বীকার করতে পারলাম না।“
“ঠিক আছে। করতে হবে না। শুধু তোমার ফোন নম্বর দাও। মাঝে মাঝে কথা বলব।“
এইবার চিন্তান্বিত হলাম। যদি মেয়ে হয়, সে কি মানসিক রোগী? যদি না হয়, তা হলে অভিসন্ধি নিয়ে কি কেউ? নাকি ইয়ার্কি মারছে?
দরকার নেই ভেবে। ঘুম আসছে। সরাসরি ব্লক করে দিলাম সবুজ পাতাকে!
এরপর ভাবলাম সত্যি মেয়ে হলেতো সে আমার বড় মেয়ের বয়সী। আহ কাজটা কী ঠিক করলাম!

তুমি ভালো থেকো মা, নিরাপদে থেকো।আর বাবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে তুমি বাবার এই ফুলটি উপহার হিসেব গ্রহণ করো। কারণ তোমার জীবনের পাতা তে তো হেমন্তর সোনালী রঙ অনেকদিন আগেই লেগেছে।