নীড় হারা পাখি

কবিঃ আফতাব মল্লিক

মা, আমি জানিনা তুমি কেমন আছো।নিশ্চই ভালো আছো !
বাবা ভালো আছে ?
আচ্ছা, বাবা কি এখনও তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে রোজ ?
তা করুক একটুখানি ।
সারা জীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে, লোকটা তো তোমার সঙ্গ ছাড়া কিছুই পায়নি ।
আর তুমিও তো বাবাকে খুব ভালোবাসো ।
আমার মনে আছে,,,,,,,,,,,
যেদিন বাবার রাত হতো বাড়ি ফিরতে,
আমাদের খাইয়ে দিয়ে, তুমি না খেয়ে কেমন দরজার কাছে বসে থাকতে মনমরা হয়ে !
বড়ো হয়ে বুঝে ছিলাম ওটাই ভালোবাসা ।
ভালোবাসা সবার কপালে থাকে না মা ।
আচ্ছা মা ? যে আমগাছটার নীচে বসে, সারাদিন আমি ধুলো নিয়ে খেলা করতাম !
কাদামাটি দিয়ে পাখি, ঘোড়া, হাঁস তৈরি করতাম !
আর তুমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে আমাকে দেখে যেতে, আর বলতে !
ইসসসস্ ।একেবারে ভুত হয়ে গেছিস !!!
সেই আমগাছটা এখনও আছে মা ?
আর মা ? বাবার সেই সাইকেলটা আছে?
যেটাকে বাবা রোজ ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পরিস্কার করতো ? আর নারকেল তেল লাগিয়ে দিতো বল, বিয়ারিং গুলোয় ?
ওটাতেই তো আমি সাইকেল চড়া শিখেছি !
কি যে আনন্দ হয়েছিলো না! যেদিন প্রথম সাইকেল চড়া শিখলাম ।
এখন আমার কোনো আনন্দ নেই মা জীবনে !
আমার জীবনের আনন্দ, খুশি গুলো, সব মেঘ হয়ে উড়ে গেছে আকাশে !
যার নাগাল আমি আর কোনোদিনও পাবো না !
যে রঙীন স্বপ্ন কে বাস্তব ভেবে, তোমাদের সবাইকে ছেড়ে, হাজার মাইল দূরে চলে এসে ছিলাম !
সে স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে গেছে অনেক দিন আগেই !
আমি আর কোনো স্বপ্নই দেখি না মা !
শুধু তোমাকে দেখার ইচ্ছেতে মনটা খুব কাঁদে !!
তোমার মনে আছে মা ?
একবার আমি দুষ্টুমি করে একটা পেঁপে গাছ ভেঙে দিয়েছিলাম বলে,
তুমি উনুনের জ্বাল দেওয়া লাঠিটা নিয়ে আমায় মেরে ছিলে ?
তোমার অজান্তেই লাঠিটা আমার কনুইতে লেগে ছিলো ।
খুব ব্যাথা হয়ে ছিল।
কাঁদতে কাঁদতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম !
তারপর ঘুম ভেঙ্গে দেখি , তুমি আমার পাশে বসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছো ব্যাথার ওপর ।
আর তোমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ।
ছোটো হলেও তখন বুঝে ছিলাম, আমার থেকে তুমি বেশি ব্যাথা পেয়েছো ।
এখন ইচ্ছে করে ,খুব করে কাঁদি তোমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে ।
আর আমার চোখের জল তোমার দুটো পা গড়িয়ে পড়বে ।
আর তুমি আবার সেই ছোট্টোবেলার মতো ঘুম পাড়িয়ে দেবে সেই গানটা গেয়ে !
“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি আয় না কাছে আয় ,
সোনার কাঠি বুলিয়ে দিবি খোকন সোনার গায় ” !!
আর আমি চুপটি করে ঘুমিয়ে পড়বো ।
তারপর সকাল বেলা তুমি ডাকবে ,,,,,,
এই বাবু ওঠ , পড়তে বসতে হবে বাবা !
খুব মনে পড়ে মা, ছোটবেলার সেই সন্ধ্যেগুলো !
আমায় কোলে নিয়ে তুমি বলতে,,,,,,,,
“চাঁদ মামা চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা”। আর আমার কপালে আঙ্গুল দিয়ে একটা টিপ এঁকে দিতে !
জানো মা , এখন আমি রোজ কপালে হাত দিয়ে সেই টিপটা খুঁজি ! যেখানে তুমি আমার সব সুখ রেখে দিয়েছিলে !
এখন আমি সারারাত চোখ বুজে পড়ে থাকি ।কখন তুমি আসবে, হাত বুলিয়ে দেবে আমার বুকে! যে বুকে এখন একরাশ ব্যথা !
এসো না মা ? আবার কোলে বসিয়ে চাঁদের চরকা বুড়ির সুতো কাটা দেখাবে !

তোমার মনে আছে মা ?একবার আমি, আকাশের একটা উল্কা দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলাম !
আর আমার মাথাটা তোমার নাকে লেগেছিলো , খুব জোরে ।
তুমি কিন্তু তোমার নাকে হাত বোলাওনি !
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলে , যদিও আমার লাগেনি খুব একটা ।
এখন আমি আকাশ দেখি না মা !!!!!,,,,,,,,,,,
আমার জীবনও একটা উল্কার মতো দিশেহারা এখন !
আজকে আমার ভীষণ জ্বর । কেউ নেই কপালে হাত দিয়ে দেখার মতো !
আজকে খুব মনে পড়ছে সেই দিন গুলো ।যখন জ্বর হলে আমি বিছানায় ছটফট করতাম!
তুমি পাশে বসে কপালে জলপটি দিয়ে দিতে , আর বলতে,,,,,,,,
খুব কষ্ট হচ্ছে না রে বাবু ?
আর পায়ে হাত দিয়ে বলতে । এই দেখ্ তোর পা গরম হয়ে গেছে ।জ্বর নেমে যাচ্ছে মাথা থেকে ।
তখন ১০২ জ্বর নিয়েও মনে হতো, জ্বরটা কমে আসছে !
আজ সন্ধ্যে থেকে শুয়ে আছি।আর কেনো জানি না শুধু মনে হচ্ছে তুমি আসবে ।
সত্যি তুমি আসবে? এসো না মা !
আজ খুব ইচ্ছে করছে তোমার আদর খেতে ।তোমাকে দেখতে ।
একবারটি এসো না মা । তোমার পায়ে জড়িয়ে ধরে বলি ,,,,,,,,,
এই স্বর্গ ছেড়ে আমি আর কখখনো কোথাও যাবো না ।
মা, দেখো,
এই আমি চোখ বুজে শুয়ে পড়লাম ।সকালে তুমি এসে বোলো কিন্তু ।
এই বাবু ওঠ্ , আর কতো ঘুমাবি ? দেখ্ বেলা কত্তো ওপরে উঠে গেছে !
তুমি যদি না আসো !না ডাকো!তাহলে আমি আর কখ্খনো উঠবো না । ,,,,,,,,,,,,,,,
কোনোদিন না ,,,,,,,,,,,,,,!!!!!