বাবার জন্য ভালোবাসা

           লেখক: কামাল এম মোস্তফা (যুক্তরাষ্ট্র)

রুটি রুজির কর্ম শেষ করে ব্যক্তিগত একটি কাজে কয়েকদিন পূর্বে দুপুরে ডেট্রয়েট ডাউনটাউন এ গিয়েছিলাম। সেখানে স্ট্রিট পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে নির্ধারিত অফিসে ঢুকি। অফিস রুমটি মূলত পাঁচ তলায় অবস্থিত। আমি লিফটে করে পাঁচ তলায় যাই।

মুল অফিসের দরজার কর্তব্যরত সিকিউরিটি অফিসার জানতে চায় আমার এপয়েন্টমেন্ট আছে কিনা ? আমি বলি এপয়েন্টমেন্ট নেই। যদি ওয়াকিং হিসাবে সুযোগ দাও। সে বলে এপয়েন্টমেনট ছাড়া ঢোকা যাবে না। অগত্যা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে লিফটের দিকে ফিরে আসি।

ঠিক সেই মুহূর্তে লিফটের ভেতর থেকে একজন বয়স্ক মহিলা আমাকে ডাকছে । আমি লিফটে ঢোকার পর মহিলা জিজ্ঞাসা করছে তুমি কোন ফ্লোরে নামবে। আমি বললাম সোজা নিচের দিকে গ্রাউন্ড ফ্লোর। আমার কণ্ঠ শুনে আর চেহারা দেখে উনি আমাকে বলেন আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ। আমি বলি ইয়েস। তখন তিনি বলেন , আমার জন্মদাতা বাবা বাংলাদেশি।

মহিলার কথা শুনে আমি চমকে যাই। তিনি দেখতে সাদা চামড়ার মানুষ। শব্দ চয়ন ও উচ্চারণে আমেরিকান রীতির অনুসরণ করেন। আমার তখন মনে পড়ে গেল এম আই টি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বিবেক ব্লেড এর লিখা দ্য লস্ট হিস্ট্রি অফ বাংলা হারলেম বইয়ের কথা। এরা ই হচ্ছে মুলত ঐ বইয়ের মুল চরিত্র। যাদের নিয়ে ঐ লেখক গবেষণা করেছেন।

বয়স্ক মহিলার চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো , তিনি যেন আমার মুখাবয়ে তার বাবার ছবি খুঁজছেন। আমি সম্মোহিত হয়ে পড়ি। ততক্ষণে লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোর এসেছে। মহিলা অতি আগ্রহ নিয়ে অনর্গল ইংরেজিতে বলছেন আমার বাবা চৌধুরী। তার বাড়ি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটে। তুমি কি সিলেট চেনো ? আমি বললাম আমার বাড়ি ও সিলেট অঞ্চলে। ৭৭ বছর বয়স্ক মহিলা বিরতিহীন ভাবে বাবার গল্প বলে যাচ্ছেন।

৪৫ বছর আগে বাবাকে হারিয়েছেন। এখনো বাবার স্মৃতি তার অন্তরে গেঁথে আছে। বাবার দেশ বাংলাদেশ নিয়ে তিনি গর্ববোধ করেন। বাবার মায়া মমতা থেকে বুঝেছেন বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো। স্ত্রী সন্তানদের প্রতি খুব দায়িত্ব শীল। ছোট বেলা বাবা কে নিয়ে তার অনেক স্মৃতি। তার এক কন্যা সন্তান কে ও বাবা অনেক আদর যত্ন করতেন।

ছোট বেলা বিশেষ দিনে বাবার সাথে বাংলাদেশ থেকে আসা অনেকের সাথে ডাউন টাউনে একটি বিল্ডিং এ আডডা হতো। আমরা সারাদিন সেই আডডায় থাকতাম। বাংলাদেশি খাওয়া দাওয়া হতো। তখন আমার বয়স আট নয় হবে। আজ থেকে সত্তর বছর আগের কথা বলছি।

সামাদ আঙ্কেল নামে বাবার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি পন্টিয়াক চলে যান। উনার মেয়ের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল।এখন জানি না ওরা কোথায়। আমি ইঙ্কস্টার সিটিতে থাকি। আমার বাবা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। তার কিছু দিন আগে উনার বোন দেশে মারা যান। বাবার ইচ্ছা ছিল আমাদের নিয়ে বাংলাদেশে যাবেন। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে বাবা আর জীবদ্দশায় যেতে পারেন নি। ব্রিটিশরা চলে যাবার পর পাকিস্তানে নানা সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৬৫ পাক ভারত যুদ্ধ , তার পর ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান যুদ্ধ। এসব কারণে বাবার আর দেশে ফেরা হয়নি। আমার অনুসন্ধিত্সু মন বাবা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চায়।

করোনা ভাইরাসের কারণে আমরা উভয়েই মুখোশ পরিহিত । আমি তাকে বলি বাবার সাথে কি তোমার কোন ছবি আছে। সে বলে আছে তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। এখন আমার বয়স ৭৭। আমি যখন আমার বাবা মায়ের সাথে ব্রুকলিন নিউ ইয়র্ক থেকে মিশিগান মুভ করি তখন আমার বয়স অনেক কম ছিল সাত কি আট।

বাবা আমার ছোট ভাই ও আমাকে খুব আদর করতেন। বাবা সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডন হয়ে নিউইয়র্ক আসেন।সেখানেই আমার মায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বাবার জীবন খুব কঠিন ছিল। কিন্তু পরিবারের প্রতি আমার মায়ের প্রতি আমার প্রতি বাবার ভালবাসার কোন কমতি ছিল না।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার মায়ের সাথে আমার বাবা ছিলেন । কখনো আমার মায়ের সাথে ঝগড়া বিবাদ করেন নি।

তাই বাংলাদেশীদের দেখলেই আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশিরা কেমন ? তারা সবাই আমার বাবার জাতীয়তা লালন করে। তাই বাংলাদেশীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শেষ নেই। তোমাকে দেখেই আমি আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করেছি। মনে হয়েছে তুমি আমার বাবার দেশের লোক।

তোমরা বাংলাদেশীরা খুবই বন্ধুবৎসল অতিথি পরায়ণ ও পরিবার বান্দব। আমি তখন তাকে বললাম আমি নিজেও এসব নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করি। আমাদের পূর্ব প্রজন্মের বাংলাদেশীদের কঠিনতম জীবনাচার।

মহিলাটির নাম মারিয়া ফিন। বাবার জন্য বৃদ্ধা মারিয়ার এখনও প্রচন্ড ভালোবাসা।এখন ও বাবার কথা বলতে বলতে তার চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠে। আমি তার দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছি। তার নিকট তার বাবার ছবি চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম পরিচয়ে দিতে অনিহা প্রকাশ করেছে। যে কারণে তার ছবি ক্যামেরায় ধারণ করিনি।

আমি তাকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম তুমি কোন ধর্মের অনুসারী। সে বললো বাবা থাকতে আমি ইসলাম ধর্মের অনেক বিষয় শিখেছিলাম। পরে মায়ের প্রভাবে ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী হই। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম হ্যামট্রামিক সিটিতে অনেক বাংলাদেশী বসবাস করে তা কি জানো। সে বলে আমি পত্র পত্রিকায় দেখেছি। কিন্তু কাউকে চিনি না। তবে সময় হলে একদিন যাবো। সেখানকার রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশি কারি খাবো।