বাবা আমাদের আকাশ , অনিঃশেষ প্রেরণার নাম

লেখকঃ নূরজাহান শিল্পী

ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধকেই বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা ও অর্জন বলে চিহ্নিত করা যায় দ্বিধাহীন চিত্তে। সেদিন নির্মম হত্যাযজ্ঞ দেখেছিল একটি জাতি।সেদিন সমাজের আলোকিত বুদ্ধিদীপ্ত জন পিচাশদের হত্যার শিকার হয়ে বরণ করেছিলেন নির্মম মৃত্যুস্বাধীনতা। শত্রু মুক্ত বিহঙ্গের উচ্ছ্বাস নয় ,জড়িয়ে আছে সন্তানহারা মায়ের দীর্ঘশ্বাস। মুক্তিকামী শহীদের আত্মত্যাগ, লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চলচ্চিত্রকার, বুদ্ধিজীবী, সহ সকল সাধারণ আপামর জনতা তিরিশ লক্ষ কিংবা তাঁর অধিক শহীদের রক্তে রঞ্জিত একটি জাতির হাজার বছর পিছিয়ে পরার গল্প নিয়ে এসেছে বিজয়।

বীরউত্তম, বীরশহীদ, বীরপ্রতীক, বীরঙ্গনা সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই সুবর্ণ ক্ষন। আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুন নুর, এই বিজয়ের লগ্নে নিজেকে গর্বিত বোধ করি, কারন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবং আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। যারা সেদিন প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে আমাদের উপহার দিয়েছিলেন মুক্তির মহাকাব্য লাল সবুজের একটি পতাকা, একটি মানচিত্র।

একটি জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ করার সুযোগ একবারই ঘটে।১৯৭১-এর সেই মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন, সর্বকালের জন্য তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। আমার বাবা বলেন, দেশমাতৃকার টানে জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে গিয়েছি এটা আমার দায়িত্ব এবং দেশের মাটি ও মানুষকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। বাবার মুখে এই কথা শুনে শুনে বড় হয়েছি।

আমার সহজ সরল বাবার দুটো কথা না বললেই নয়, আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা দেশমার্তৃকা ও সন্তানদের উজাড় করে ভালোবাসা দেয়া ছাড়া আর কিছুই সঞ্চয় রাখেন নি তাঁর জীবন খাতায়। গাড়ি বাড়ি ব্যংক ব্যালেন্স নেই, নেই অপ্রাপ্তির আক্ষেপ। অতি সাধারণ আমার বাবা লুঙ্গি ও গ্রীষ্মকালে হাঁটু পর্যন্ত ফতোয়ায় চিরসুখী আমাদের প্রথম হাতে খড়ি বাবার কাছে। স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ নামতা ধারাপাত ; মধ্যাঙ্গুলির ফাঁকে কলম ধরতে না পারার অপরাধে জালিবেতের বারী কত শত।

বাবা আমাদের আকাশ, অনিঃশেষ প্রেরণার নামবাবার কাছে জেনেছি জীবনের অর্থ, মানবতার আলোয় নিজেকে দুত্যিময় করে তোলা। আমাদের বাবা ইলিশের মৌসুম শুরুর আগে চড়া দামে ইলিশ কিনে মায়ের উপহাস উপেক্ষা করে সন্তানদের সামনে মুখভর্তি গর্বিত হাঁসি। ফলের মৌসুমে বাড়তি দামে খাঁচায় সজ্জ্বিত আমে তাঁর ছাতি দ্বিগুন আনন্দ যেন রাশি রাশি। আমার বাবা আমরা অসুস্থ হলে মায়ের সাথে তিনিও সারারাত জেগে মুখপানে তাকিয়ে থাকা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় রাত্রি যাপন।

পরীক্ষা শেষে বের হয়ে বাবাকেই পেতাম প্রথম ক্লাসকক্ষের বাইরে। আমাদের মলিন মুখ বাবাকে ভেঙে ছুঁড়ে রেখে দিতো হেরে যাওয়া সৈনিকের মতো। আমার বাবা কখনোই হারবেন না, হারতে দেবো না ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বট গাছটির মতো। সকল রোদ বৃষ্টি ঝড় থেকে আমাদের আড়াল করে রাখা আমার বাবা স্মৃতিশক্তি কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে।বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তবে মনোবল অটুট রেখে জীবনের রোজনামচায় সুখী একজন মানুষ। মোনাজাতে দোয়ায় সন্তানদের মঙ্গল কামনায় সদা জাগ্রত।মহান রাব্বুল আলামীন বাবাকে শতায়ু দান করুন।