গিয়াসউদ্দিন আউয়াল : পরিশ্রমী সাংবাদিকের নাম

ফারজানা আক্তার চৌধুরীঃ প্রাচীনকাল থেকে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে গরীয়ান জনপদের নাম সিলেট। ভাষা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জীবনাচার, সমাজজীবন, জ্ঞানচর্চা ইত্যাদিতে রয়েছে পূণ্যভূমি সিলেটের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য। অলিকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল (রহঃ) ও তদীয় ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এ পুণ্যভূমিতে যুগে যুগে জন্মেছেন খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদসহ মরমী গানের বহু পদকর্তা সংগীতজ্ঞ। সর্বভারতীতে রয়েছে এঁদের ঈর্ষণীয় সুনাম। সিলেটের পবিত্র মাটির আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা প্রতিশ্রুতিশীল পরিশ্রমী এক সাংবাদিকের নাম গিয়াসউদ্দিন আউয়াল।

জন্ম ১৯৫১ সালের ২৩ মার্চ সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার জালালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতা ইউনুস আলী মেম্বার ছিলেন অবিভক্ত ভারতে প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার। তাঁর ঠিকাদারি ব্যবসা আসামের ডিমাপুর ও ডিব্রুগড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি ছিলেন মানবদরদী, সমাজ হিতৈষী সালিশি ব্যক্তিত্ব। তাঁর বড় ছেলে মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আলহাজ্ব এম. বশির আহমেদ ছিলেন সত্তর দশকের দাপুটে সাংবাদিক।আশি/নব্বই দশকে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রাইম রিপোর্টারের খ্যাতি অর্জন করেন। দ্বিতীয় ছেলে আলহাজ্ব এম. মনসুর আহমেদ ছিলেন নব্বই দশকের শেষের দিকে ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ সৈদেরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সফল চেয়ারম্যান।

তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন আউয়াল যোগ্যতাবলে সংবাদপত্র জগতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজের স্থান করে নিতে সক্ষম হন।গিয়াসউদ্দিন আউয়াল স্কুল জীবনে পিতার ইচ্ছায় বড় ভাই বিশিষ্ট সাংবাদিক এম. বশির আহমেদের পদাঙ্ক অনুসরণের বাসনা পোষণ করেন।

উচ্চমাধ্যমিক সমাপ্তির পর ডাক আসে ঢাকা থেকে। চলে যান সেখানে। বড় ভাইয়ের উৎসাহ প্রেরণায় ১৯৭৩ সালের গোড়ারদিকে যোগদান করেন দেশের প্রাচীন কুলীন পত্রিকা দৈনিক আজাদে। একই সময়ে এবং পরবর্তীতে সাপ্তাহিক গণবাংলা, সাপ্তাহিক আখবার, সাপ্তাহিক খবর, দৈনিক দেশ বাংলা, দৈনিক বাংলারমুখ ও দৈনিক শক্তিতে কর্মরত ছিলেন।

প্রায় দুই বছর দৈনিক আজাদ এ কাজ করার পর একসময় আর্থিক টানাপোড়েন সর্বোপরি এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হয়ে প্রাচীন এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। চলে আসেন সিলেটে। পরিচয় হয় দেশের সর্বপ্রাচীন চলমান সাপ্তাহিক পত্রিকা যুগভেরীর নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে।

তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতায় যুক্ত হোন ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক যুগভেরীতে। এখানে কর্মরত থাকাকালে তিনি প্রাচীন এই পত্রিকার ইতিহাস সংরক্ষণের কাজে মনোনিবেশ করেন। দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল হিসেবে চমক সৃষ্টি করে ২০০১ সালে প্রকাশ করেন ‘যুগভেরী/ একটি প্রাচীন বাংলা সংবাদপত্র’ নামক একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ। এককভাবে কোন পত্রিকার ইতিহাস সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থ রচনা সম্ভবত এটিই প্রথম।

গ্রন্থটিতে শুধুমাত্র যুগভেরীর ইতিহাস বিবৃত হয়নি প্রাসঙ্গিকভাবে সংগৃহীত নানা তথ্য উপাত্তের সংযোজন ইতিহাসের উপাদান হিসেবে কাজে লাগতে পারে সিলেটের সাংবাদিকতা মনস্ক সংবাদপত্রসেবী লেখক- গবেষকদের। অর্ধশত বছরের বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতা জীবনে তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন বিভিন্ন বিষয়ে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। প্রকাশনা ও সম্পাদনা করেছেন সাহিত্য সংকলন ‘জন্মে সুখ’ (১৯৭৬), ‘সিলেট পৌর পরিক্রমা’ (১৯৮৯) এবং রচনা করেন ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম পত্রিকা সাপ্তাহিক যুগভেরীর ইতিহাস সমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘যুগভেরী/ একটি প্রাচীন বাংলা সংবাদপত্র’ (২০০১)। লিখেছেন বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গল্প, ফিচার স্মৃতিচারণমূলক লেখা। তাঁর লেখা সমূহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়।

দেশপ্রেমী, প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী উদার ও মুক্ত মনের মানুষ গিয়াসউদ্দিন আউয়াল। তাঁর সততা, একনিষ্ঠতা, বিচক্ষণতা ও মেধা – মনন তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একজন বড় মাপের সাংবাদিক হিসেবে। দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে তাড়িত করে। আর এ দায়বদ্ধতাবোধ থেকে লিখে চলেছেন সময়-সুযোগ পেলেই। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তাঁকে আহত করে ভীষণভাবে। উদাহরণস্বরূপ অনেকগুলোর মধ্যে তিনটি লেখার শিরোনাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক যুগভেরীতে ‘আসুন সকলে মিলিয়া চরিত্র গঠন করি’, ১৯৭৬ সালে একই পত্রিকায় ‘পাগলাঘোড়ার লাগাম টানা দরকার’ এবং নিউইয়র্কস্থ জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ঠিকানায় ২০২১ সালের শেষের দিকে ‘আসুন স্বার্থকে বলিদান দিয়ে আত্মশুদ্ধ হই’। বস্তুত তাঁর সব লেখাই সুধীজনের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয় এবং পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গিয়াসউদ্দিন আউয়াল – এর মূল্যায়ন হলো- “মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, আছে স্বার্থ ও ক্ষমতা প্রেম। সততা নেই আছে শঠতা। সত্য সুন্দর নির্বাসিত।মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে।” ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা বাঙালিরা বীরের জাতি।আমরা পারি না এমন কোন কাজ নেই। প্রয়োজন সদিচ্ছা আর সততা। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইচ্ছাশক্তিকে গঠনমূলক কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। তখন আর কল্পনায় নয় বাস্তবে সোনার বাংলা হবে বাংলাদেশ।”

বর্তমান সময়ের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, “সংখ্যায় বেশি নয়, মানসম্পন্ন কম সংখ্যক সংবাদপত্রই পারে দেশ – জাতি – সমাজের কল্যাণ করতে। আর সাংবাদিক বা সাংবাদিকতার প্রশ্নে বলা যায়- বিখ্যাত নয়, সৎ থেকে বস্তুনিষ্ঠতার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন অধিকতর শ্রেয়।”

গিয়াসউদ্দিন আউয়াল বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে মদনমোহন কলেজে অধ্যায়নকালে সদ্য স্বাধীন দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠনে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর উদ্যোগে ১৯৭৬ সালে সাহিত্য সংগঠন ‘ভোরের আলো সাহিত্যগোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে এডভোকেট সুলতানা কামালের নেতৃত্বে গঠিত ‘মুক্ত নির্বাচন আন্দোলন’ সিলেটের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে গঠিত ম্যাগাজিন প্রতিবেদক সমিতি, সিলেট-এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির প্রথমে আহ্বায়ক ও পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে সে-সময়ে ম্যাগাজিন প্রতিবেদনে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে এবং সূচিত হয় নতুন ধারা। তৎকালে জাতীয় ও স্থানীয় পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি ম্যাগাজিনও হয়ে ওঠে সমান জনপ্রিয়।

১৯৭৩ সালে গিয়াসউদ্দিন আউয়াল দৈনিক আজাদে কর্মকালীন সময়ে ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য পদ লাভ করেন। তৃতীয়বার পুর্নগঠিত সিলেট সাংবাদিক ইউনিয়ন (এসইউজে) এর কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন ১৯৮৯ সালে। ১৯৯০ সালে প্রথম লাভ করেন সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য পদ। প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করে প্রথমবার প্রকাশ্যে প্যানেলভিত্তিক নির্বাচনে স্বাধীনতার পক্ষশক্তির পক্ষে তিনি ছিলেন সভাপতি পদপ্রার্থী। বর্তমানে প্রবাস জীবনে নিউইয়র্কস্থ ‘গ্রেটার ছাতক সমিতি’র উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন।গিয়াসউদ্দিন আউয়াল শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি অসাধারন বুদ্ধি সম্পন্ন সৃজনশীল লেখকও। তাঁর রচনাশৈলী পাঠক ও সুধীমহলে সমাদৃত। সাহিত্যের নানা শাখায় রয়েছে সরব পদচারণা। সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস – ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। তিনি একাধারে কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও গল্প লেখক হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত।২০১৪ সাল থেকে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে সহাবস্থান করেও সত্তরোর্ধ বয়সে তারুণ্যে উদ্দীপ্ত হয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন নানা প্রসঙ্গে নানা বিষয়ে। তাঁর গঠনমূলক ক্ষুরধার লেখা দেশ – জাতি ও সমাজের কল্যাণে ব্রতী হোক। কামনা করি তাঁর সুস্থ-সুন্দর দীর্ঘজীবন।

গিয়াসউদ্দিন আউয়াল- এর মতো একজন গুণী সাংবাদিককে নিয়ে লিখেছেন সিলেট থেকে সাংবাদিক, লেখক – গবেষক আ. ফ. ম সাঈদ ও যুক্তরাজ্য থেকে কবি, সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক সাঈদ চৌধুরী। তাঁদের মূল্যবান লেখা দুইটি মিশিগান প্রতিদিনের সম্মানিত পাঠকদের সম্মানার্থে পত্রস্থ করা হলো।
সম্পাদক, মিশিগান প্রতিদিন।

আত্মস্মৃতিমূলক বই লিখছেন সাংবাদিক গিয়াসউদ্দিন আউয়াল।

সাঈদ চৌধুরীঃ সাংবাদিক গিয়াসউদ্দিন আউয়াল আত্মস্মৃতিমূলক বই লিখছেন। পিছনে ফেলে আসা বিস্মৃতপ্রায় জীবনের কথা লিখতে শুরু করেছেন। আমেরিকা প্রবাসী এই লেখক-সাংবাদিকের জন্ম ১৯৫১ সালের ২৩ মার্চ। ৭০ বছর বয়সেও চির তরুন। শুধু রঙ বদলেছে কিছুটা। জীবনের ৭১তম বছরে দাঁড়িয়ে এখনো তিনি দিব্যি লিখে যাচ্ছেন।

১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারী জাতীয় দৈনিক আজাদে জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে গিয়াসউদ্দিন আউয়ালের কর্ম জীবনের সূচনা। তার বড় ভাই এম বশির আহমদ ছিলেন আজাদের সংসদ ও ক্রাইম রিপোর্টার। ভাইয়ের প্রেরণায়-উৎসাহে এই মহান পেশায় যুক্ত হন। তখন মুক্তিযুদ্ধ সবে সমাপ্ত হয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশ ও লাল সবুজের জাতীয় পতাকা। সর্বত্র তারুণ্যের জয়গান।

তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- অসম্ভবের অভিযানে এরা চলে/ না চলেই ভীরু ভয়ে লুকায় অঞ্চলে!/ এরা অকারণ দুর্নিবার প্রাণের ঢেউ/ তবু ছুটে চলে যদিও দেখেনি সাগর কেউ।

১৯৩৬ সালের ২১ অক্টোবর দৈনিক আজাদের জন্ম। কলকাতা থেকে প্রকাশিত একসময়কার প্রভাবশালী বাংলা পত্রিকা ‘দৈনিক আজাদ’। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত পত্রিকাটি প্রকাশের অল্প দিনের মধ্যেই বঙ্গ ও আসামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পত্রিকার কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ভাষা আন্দোলনে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকার বিরোধী সংবাদ প্রকাশের কারণে নানাভাবে চাপে পড়তে হয়, এমনকি বিজ্ঞাপনও বন্ধ করে দেওয়া হয়। আইয়ুব খানের স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে দৈনিক আজাদ জোরালো ভূমিকা রাখে।

১৯৬৯ সালে মোহাম্মদ আকরম খাঁর মৃত্যুর পরে পত্রিকার মালিকানা রদবদল হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় এটি প্রকাশিত হয়। এরপর ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে প্রকাশনা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

গিয়াসউদ্দিন আউয়াল যখন সাংবাদিকতা শুরু করেন, তখন দেশ সেরা লেখকদের ঠিকানা ছিল দৈনিক আজাদ। এক ঝাক তরুণের মধ্যে তিনি ছিলেন আলোচিত তারকা। দেখতেও নায়কের মত।

দৈনিক আজাদে প্রবীণের প্রজ্ঞা আর নবীনের বল-বীর্য উদ্দীপনায় স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতার কথা বলতে গিয়ে গিয়াসউদ্দিন আউয়াল বার বার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে বলেই তার ধারণা।

একান্ত আলাপচারিতায় বললেন, সাংবাদিকতা কীভাবে জীবনে পেশা ও নেশায় পরিণত হল। সংবাদপত্রে কাজ করবেন এমন কোনো ভাবনা মনের মাঝে ছিল না। বড় ভাইয়ের প্রেরণায় যুক্ত হয়ে কাজটা বেশ এনজয় করেছেন। আর এ থেকে বের হতে পারেননি।

দেশে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থান সাংবাদিকতার স্বাচ্ছন্দ্য গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। আর কিছু অযোগ্য লোকের কারণে সাংবাদিকতা কলুষিত হচ্ছে। গুজব এবং অসত্য খবর (ফেক নিউজ) তাকে পীড়া দেয়। আর সে কারণেই নির্মোহ বা নিরপেক্ষ রিপোর্ট করার জন্য দৈনিক আজাদের স্মৃতিচারণ করেন প্রফুল্ল চিত্তে।

বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক যুগভেরীতে গিয়াসউদ্দিন আউয়াল দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এখনো সুদূর প্রবাস থেকে যুক্ত রয়েছেন। ডাকসাইটে সাংবাদিক সিলেটের প্রাণপুরুষ আমিনুর রশীদ চৌধুরীর মালিকানায় দেশের প্রাচীনতম সাপ্তাহিক যুগভেরী মর্যাদা সম্পন্ন পত্রিকা হিসেবে সমাদৃত। যুগভেরী নিয়ে তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই কাগজের প্রতি সাংবাদিক আউয়ালের রয়েছে অসীম আবেগ ও ভালোবাসা।

একসময় মদনমোহন কলেজের মেধাবী ছাত্র গিয়াসউদ্দিন আউয়ালের গ্রামের বাড়ি সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার অন্তর্গত জালারপুর। তার মেঝ ভাই আলহাজ্ব এম মনসুর আহমদ গোবিন্দগঞ্জ সৈদেরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেন। তাদের পিতা জনপ্রিয় সরপঞ্চ মরহুম ইউনুস আলী ছিলেন অবিভক্ত আসামের প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার এবং সমাজ হিতৈষী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব।

অত্যন্ত কোমল ও প্রাণবন্ত হৃদয়ের অধিকারী গিয়াসউদ্দিন আউয়াল একজন মননশীল লেখক। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সংবাদপত্রে তিনি লিখে চলেছেন। তার প্রতিবেদন, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গল্প বেশ সুখপাঠ্য। শতায়ু হোন আমাদের প্রিয় অগ্রজ, দলমত নির্বিশেষে সকলের অন্তরতম আপনজন।

                একজন গিয়াসউদ্দিন আউয়াল।

আ.ফ.ম সাঈদঃ প্রত্যেক জিনিসে ভালো-মন্দ দুটিই থাকে। ফেসবুকেরও তা-ই আছে। আমার কাছে ফেসবুকের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনে, দূরের অচেনা মানুষকে আপন করে দেয়।

নব্বই দশকে সিলেটের দাপুটে লেখক-সাংবাদিক ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আউয়াল। হঠাৎ হারিয়ে গেলেন।তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে ফেসবুক।

আউয়াল ভাই ছাড়া সিলেটে আমাদের সমসাময়িক সাংবাদিকদের কোনো আড্ডা জমত না। তিনি ছিলেন যে-কোনো ভালো উদ্যোগের প্রাণপুরুষ। কাজ করতেন তখনকার সাপ্তাহিক যুগভেরীতে। ঢাকার একটি ম্যাগাজিনেও লিখতেন। তাকে সভাপতি করে আমরা গঠন করেছিলাম “ম্যাগাজিন প্রতিবেদক সমিতি, সিলেট”। বেশ ভালো ছিল এই সমিতির কার্যক্রম। সমিতিতে ছিলাম আমি, ইকবাল কবির, ম.আনফর আলী (মরহুম), করিম আহমেদ, মোহাম্মদ মহসিন প্রমুখ।

আউয়াল ভাইয়ের কয়েকটি প্রকাশনাও আছে। তার লেখা “সিলেট পৌর পরিক্রমা” একটি প্রামাণ্য ও খুব প্রয়োজনীয় গ্রন্থ। অধুনা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পূর্বসূরি সিলেট পৌরসভার ইতিবৃত্ত জানার জন্য ওই বইয়ের আশ্রয় নিতেই হয়। এছাড়াও গিয়াস উদ্দিন আউয়ালের লেখা “যুগভেরী একটি প্রাচীন বাংলা সংবাদপত্র” বইটিও গবেষণামূলক গ্রন্থ। “জন্মে সুখ” এবং “সিলেট প্রেসক্লাবের ইতিকথা” নামে তার আরো দুটি বই রয়েছে।

গিয়াস উদ্দিন আউয়ালের বড়ো ভাই (মরহুম) বশির আহমদও ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক। তিনি কয়েক দশক ঢাকার দৈনিক সংবাদ পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার ছিলেন। আরেক ভাই (মরহুম) হাজি মনসুর আহমদ ছিলেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান।

আউয়াল ভাই এখন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আল্লাহর অপার রহমতে আরোগ্য লাভ করেছেন। দীর্ঘ দিন যোগাযোগ ছিল না। ফেসবুকের কল্যাণে আবার আউয়াল ভাইকে ফিরে পেয়েছি। এখনো আগের মতোই তিনি প্রাণোচ্ছল ও বন্ধুবৎসল রয়েছেন। বর্তমান কঠিন যুগে তার মতো মানুষ খুবই বিরল।